ইরান সরকার জানুয়ারি ৮ ও ৯ তারিখে শীর্ষে পৌঁছানো প্রতিবাদে কঠোর দমন চালিয়ে, এখন পর্যন্ত ৫০,০০০‑এর বেশি নাগরিককে গ্রেফতার করেছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (HRANA) মঙ্গলবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা ৫০,২৩৫ পর্যন্ত পৌঁছেছে এবং নতুন গ্রেফতার এখনও চলমান। এই পদক্ষেপের পেছনে সরকার দাবি করে যে বিদেশি সমর্থিত দাঙ্গা চালু করার জন্য কিছু লোককে “দাঙ্গা চালক” বলা হচ্ছে।
HRANA রেকর্ডে দেখা যায়, গ্রেফতারের মধ্যে শিক্ষার্থী, লেখক, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ অন্তর্ভুক্ত। সংস্থা উল্লেখ করেছে যে, কিছু ক্ষেত্রে বাড়িতে অনুসন্ধান করা হয়েছে এবং ব্যক্তিগত সামগ্রী জব্দ করা হয়েছে। এই ধরনের কার্যক্রমের ফলে সমাজের বিভিন্ন স্তরে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
গ্রেফতারকৃতদের ওপর বাড়ি অনুসন্ধান এবং সম্পত্তি জব্দের পাশাপাশি, সংস্থা ৩০০টিরও বেশি জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি রেকর্ড করেছে। এসব স্বীকারোক্তিতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যেখানে সন্দেহভাজনদের টেলিভিশনে বাধ্যতামূলক বক্তব্য দিতে বলা হয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গত সপ্তাহে প্রকাশিত বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে যে, হাজার হাজার মানুষ, শিশু সহ, এই দমন অভিযানে গ্রেফতার হয়েছে। তারা গ্রেফতারের পর নিখোঁজ হওয়া, নির্যাতন, কারাবাসে মৃত্যু, দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড এবং অনিয়মিত বিচারের ঝুঁকিতে রয়েছে। সংস্থা এই পরিস্থিতিকে মানবিক সংকটেরূপে চিহ্নিত করেছে।
ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গুলামহোসেইন মোহসেনি এজেই গ্রেফতারের বিরুদ্ধে কোনো রকম শিথিলতা না দেখানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, কিছু অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের সাজা আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে, যা আইনি প্রক্রিয়ার কঠোরতা বাড়িয়ে তুলবে।
সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই দমনকে বিদেশি হস্তক্ষেপের ফলাফল হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ইরান সরকার দাবি করে যে, বিদেশি সমর্থন পায় এমন “দাঙ্গা চালক”দেরই মূল দায়িত্ব, এবং তাদের দমনই দেশের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য অপরিহার্য। এই রেটোরিকের মাধ্যমে সরকার জনমতকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।
সাম্প্রতিক সময়ে, চলচ্চিত্র লেখক মেহদি মাহমুদিয়ানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি জাফার পানাহিরের “এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা” চলচ্চিত্রের সহ-লেখক, যা এই বছরের অস্কার পুরস্কার অনুষ্ঠানে সেরা আন্তর্জাতিক ছবির জন্য মনোনয়ন পেয়েছিল এবং ২০২৫ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে পাম ডি’অর জিতেছিল। একই সঙ্গে, অ্যাব্দোল্লাহ মোমেনি এবং নারী অধিকার কর্মী ভিদা রাব্বানি-কে একত্রে গ্রেফতার করা হয়েছে, কারণ তারা একাধিক কর্মীর সঙ্গে যৌথ বিবৃতি স্বাক্ষর করে সরকারের নীতি সমালোচনা করেছিল।
এই ধারাবাহিক গ্রেফতার এবং কঠোর শাস্তি নীতি দেশের নাগরিক সমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা সতর্কতা প্রকাশ করছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলি ইঙ্গিত করেছে যে, দমনমূলক নীতি অব্যাহত থাকলে স্বাধীনতা ও প্রকাশের অধিকার আরও সংকুচিত হবে, যা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিবেশকে অস্থির করতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে, ইরান সরকার গ্রেফতার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প প্রকাশ করেছে, এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই দমনকে নিন্দা করে মানবাধিকার রক্ষার আহ্বান জানাচ্ছেন। গ্রেফতার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, দেশের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত চাপ বাড়তে থাকবে, যা পরবর্তী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।



