শব-এ-বারাতের পবিত্র রাত্রি পালিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরনো ঢাকার রাস্তা ও গলিগুলো আবার হালুয়া ও রুটির গন্ধে ভরে ওঠে। চৌকবাজার, রে সাহেব বাজার, আরমানিতলা, নাজিরাবাজার, সুত্রাপুর, নারিন্দা, গন্ধারিয়া ও লক্ষ্মীবাজারে বিক্রেতারা সাময়িক স্টল গড়ে তুলেছেন। এই স্টলগুলোতে রুটির বিভিন্ন সৃজনশীল আকার ও রঙিন হালুয়া দেখা যায়, যা স্থানীয়দের পাশাপাশি শহরের ভ্রমণকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
স্টলগুলোতে রুটির ফুল, মাছ, প্রজাপতি এবং কুমিরের মতো আকৃতিতে সাজানো দেখা যায়, যা কৌতুহলজনক দৃশ্য তৈরি করে। হালুয়া রঙের সমাহার হিসেবে সাজানো থাকে এবং চানা, সেমোলিনা, গাজর, ভেজিটেবল নুডলস ও বিভিন্ন পিঠার স্বাদে ভরপুর। বিক্রেতারা রুটির মূল উপাদান হিসেবে ময়দা, দুধ, ডিম, ঘি, কিশমিশ, সাদা তিল ও কাজু বাদাম উল্লেখ করেন, আর হালুয়ার রেসিপিতে পেঁপে, কুমড়া, ডাল ও সেমোলিনার ব্যবহার হয়।
রুটির দাম কিলোগ্রাম প্রতি ২০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়, আর হালুয়ার দাম ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। দাম নির্ভর করে পণ্যের আকার ও গুণমানের ওপর। যদিও স্টল সংখ্যা বাড়লেও বিক্রয় গত বছরের তুলনায় ধীরগতিতে চলছে। অধিক স্টল ও বিক্রেতার উপস্থিতি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে তুলেছে, ফলে মোট বিক্রয় হ্রাস পেয়েছে।
গন্ধারিয়া মোড়ে ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে শব-এ-বারাতের রুটি বিক্রি করা কামাল মিয়া বলেন, “আগে এই সময়ে পরিবেশ আরও রঙিন ও প্রাণবন্ত ছিল। মানুষ একে অপরের বাড়িতে হালুয়া ও রুটি পাঠাত। এখন সেই ঐতিহ্য কমে গেছে, নতুন দোকানগুলো বেশি, তাই বিক্রি মাঝারি মাত্রায়।” তার কথায় ঐতিহ্যবাহী রীতি ও আধুনিক বাজারের পরিবর্তন স্পষ্ট হয়।
সুত্রাপুর বাজারে আল বারাকা হট ব্রেড ও লাইভ বেকারির কর্মী সিয়াম জানান, “দুপুর থেকে আমরা স্টল গড়ে তুলি। অনেক মানুষ এসে কেনাকাটা করে, তবে কিছু দাম শুনে ফিরে যায়।” তিনি উল্লেখ করেন যে দাম সম্পর্কে সচেতনতা ক্রেতাদের ক্রয় সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
রায় সাহেব বাজারের কুসুম কনফেকশনারির মালিক আহমদ শারিফও একই রকম পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি বলেন, “বছরের পর বছর এই রাত্রিতে হালুয়া ও রুটির চাহিদা থাকে, তবে এখন স্টল সংখ্যা বাড়ায়ে দাম ও গুণমানের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।” তার মন্তব্যে বাজারের গতিবিদ্যা ও গ্রাহকের পছন্দের পরিবর্তন প্রকাশ পায়।
বিক্রেতারা উল্লেখ করেন যে রুটির তৈরি প্রক্রিয়ায় ময়দা, দুধ, ডিম ও ঘি মিশিয়ে রুটি গুঁড়িয়ে আকার দেয়া হয়, এরপর সোনালি রঙে ভাজা হয়। হালুয়া তৈরিতে পেঁপে, কুমড়া, ডাল ও সেমোলিনার মিশ্রণ গরম করে মিষ্টি স্বাদ যোগ করা হয়। উভয় পণ্যের স্বাদ ও গন্ধ শব-এ-বারাতের রাতের উল্লাসে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
এই বছরের শব-এ-বারাতের রাত্রিতে পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোর উপস্থিতি স্থানীয় সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে। যদিও বিক্রয় পরিমাণে কিছু হ্রাস দেখা গেলেও, রুটি ও হালুয়ার রঙিন স্টলগুলো শহরের রাত্রিকালীন দৃশ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
বাজারের ভিড়ের মধ্যে দেখা যায় তরুণ ও বৃদ্ধ, স্থানীয় ও বিদেশী পর্যটক, সবাই হালুয়া ও রুটির স্বাদ উপভোগ করতে আগ্রহী। এই সমাবেশে ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে খাবারের সাংস্কৃতিক সংযোগও স্পষ্ট হয়।
স্থানীয় প্রশাসন এই ধরনের ঐতিহ্যবাহী বাজারকে সমর্থন করার জন্য নিরাপত্তা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়ই নিরাপদ পরিবেশে শব-এ-বারাতের রাতের আনন্দ উপভোগ করতে পারছেন।
সারসংক্ষেপে, শব-এ-বারাতের রাতে পুরনো ঢাকায় হালুয়া ও রুটির স্টলগুলো ঐতিহ্যবাহী স্বাদ ও আধুনিক বাজারের মিশ্রণ উপস্থাপন করেছে। দাম ও প্রতিযোগিতার পরিবর্তন সত্ত্বেও, এই খাবারগুলো শহরের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে রয়ে গেছে।



