ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল রটারড্যাম (আইএফএফআর) এর ৫৫তম সংস্করণে মিশরের বিশিষ্ট পরিচালক মারওয়ান হামেদ তার কাজের পেছনের কৌশল ও বাণিজ্যিক সাফল্য নিয়ে আলোচনা করেন। এই বিশেষ সেশনে তিনি সহ-পরিচালক ইউস্রি নাসরাল্লার সঙ্গে মঞ্চ শেয়ার করেন এবং দর্শকদের সামনে তার ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো তুলে ধরেন।
মারওয়ান হামেদ ইতিমধ্যে মিশরের চলচ্চিত্র জগতে একাধিক রেকর্ড ভাঙা কাজের মাধ্যমে নিজের নাম গড়ে তুলেছেন। তার সর্বশেষ ঐতিহাসিক মহাকাব্য “কিরা ও এল গিন” মুক্তির সময় দেশের সর্ববৃহৎ আর্থিক সাফল্য অর্জন করে, যা কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে দর্শকদের থিয়েটারে ফিরে আসার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
হামেদের চলচ্চিত্র যাত্রা ২০০৬ সালে শুরু হয়, যখন তিনি আলা আল আসওয়ানির উপন্যাস “দ্য ইয়াকুবিয়ান বিল্ডিং” এর স্ক্রিন রূপান্তর পরিচালনা করেন। এই প্রকল্পে তিনি তার প্রয়াত পিতা ওয়াহিদ হামেদের রচিত চিত্রনাট্যকে জীবন্ত করে তোলেন এবং একই সঙ্গে বক্স অফিসে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন। এরপরের বছরগুলোতে তিনি “ইব্রাহিম লাবিয়াদ” (২০০৯) এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক হিটের মাধ্যমে শিল্প ও বাণিজ্যিক উভয় ক্ষেত্রেই স্বীকৃতি পেয়েছেন।
সেশনের সময় হামেদ চলচ্চিত্রের গল্প গঠন ও দৃশ্য নির্মাণের পদ্ধতি সম্পর্কে বিশদে কথা বলেন। তিনি বিশেষ করে একটি স্মরণীয় রাস্তার লড়াই দৃশ্যের সৃষ্টিকর্মকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন, যা তার দ্বিতীয় ফিচার “ইব্রাহিম লাবিয়াদ”-এ দেখা যায়। এই দৃশ্যে প্রধান চরিত্র তার বাবার হত্যার পর প্রতিশোধ নিতে চায় এবং একটি পাড়া দখল করার উদ্দেশ্যে লড়াই করে, যেখানে কোনো প্রাণহানি করার ইচ্ছা নেই।
এই লড়াইয়ের কোরিওগ্রাফি তৈরির জন্য হামেদ ও তার সৃজনশীল দল তখনো তুলনামূলকভাবে নতুন একটি ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম, ইউটিউব, ব্যবহার করেন। তারা বিভিন্ন রাস্তার লড়াইয়ের ভিডিও অনুসন্ধান করে, সেগুলো থেকে চলন, ভঙ্গি ও লড়াইয়ের পদ্ধতি বিশ্লেষণ করেন এবং প্রয়োজনীয় অংশগুলো একত্রিত করে একটি রেফারেন্স গাইড তৈরি করেন। এই প্রক্রিয়ায় তারা বহু ক্লিপকে কাট-অফ করে একসাথে মিশ্রিত করে একটি ধারাবাহিক লড়াই চিত্র গড়ে তোলেন।
হামেদ উল্লেখ করেন, লড়াইয়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল পাড়ার উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা, তাই দৃশ্যটি এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে কোনো চরিত্রের মৃত্যুর ইঙ্গিত না থাকে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে চিত্রনাট্য ও অভিনয়শৈলীকে এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল যে দর্শকরা লড়াইয়ের তীব্রতা অনুভব করতে পারে, তবে তা হিংসাত্মক না হয়ে শাসনমূলক রূপে উপস্থাপিত হয়।
ইউটিউবের বিশাল ভিডিও আর্কাইভ থেকে প্রাপ্ত রেফারেন্স হামেদের জন্য একটি বাস্তবিক টুল হিসেবে কাজ করে, যা তাকে স্থানীয় সংস্কৃতি ও গ্যাংয়ের আচরণকে সঠিকভাবে পুনর্নির্মাণে সহায়তা করে। এই পদ্ধতি চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন ধরনের গবেষণা ও প্রস্তুতির উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং অন্যান্য মিশরীয় চলচ্চিত্রশিল্পীকে অনুপ্রাণিত করেছে।
আইএফএফআর-এ হামেদের এই সেশনটি শুধু তার কাজের গৌরবই নয়, ভবিষ্যতে মিশরের চলচ্চিত্র শিল্পের দিকনির্দেশনা কী হতে পারে তা নিয়ে আলোচনার মঞ্চও হয়ে ওঠে। তিনি উল্লেখ করেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক দর্শকের চাহিদা মেনে চলা ভবিষ্যৎ চলচ্চিত্রের মূল চাবিকাঠি হবে।
মারওয়ান হামেদের ক্যারিয়ার এবং তার সৃজনশীল পদ্ধতি মিশরের চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। তার কাজের মাধ্যমে দেশীয় দর্শকরা থিয়েটার ফিরে এসেছে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে মিশরের চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি বাড়ছে। ভবিষ্যতে তিনি কী ধরনের নতুন গল্প ও প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন, তা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য উত্তেজনাপূর্ণ প্রত্যাশা তৈরি করেছে।



