সিরিয়ার লেখক-নির্দেশক র্যান্ড আবু ফাখের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র “Why Do I See You in Everything?” 55তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব রটারড্যাম (IFFR) এর “ব্রাইট ফিউচার” শোতে বিশ্বপ্রিমিয়ার পেয়েছে। এই কাজটি নির্বাসিত দুই বন্ধুর জীবনের ছাপ, স্মৃতি ও স্বপ্নকে একত্রে বুনে এক নতুন বর্ণনা গড়ে তুলেছে।
র্যান্ড আবু ফাখ পূর্বে “Braided Love” এবং “So We Live” শিরোনামের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি অর্জন করেন। তার এই প্রথম বৈশ্বিক চলচ্চিত্রটি সিরিয়ার যুদ্ধ ও নির্বাসনের জটিলতা তুলে ধরতে চায়, যেখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের মেলবন্ধন দেখা যায়।
চলচ্চিত্রটি হাইব্রিড ফরম্যাটে নির্মিত; স্বপ্নের দৃশ্য, আর্কাইভাল ফুটেজ এবং বর্তমানের বাস্তব ঘটনাগুলো একসঙ্গে মিশে একটি বহুমাত্রিক বর্ণনা তৈরি করে। এই পদ্ধতি দর্শকের কাছে অতীতের স্মৃতি ও বর্তমানের বাস্তবতা একসঙ্গে অনুভবের সুযোগ দেয়।
গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে সিরিয়ার দুই বন্ধুর—কুসাই এবং নাবিলের—জীবনের যাত্রা। তারা শৈশবের কাছাকাছি সময়ে একসাথে বেড়ে ওঠে, এবং ১৬ বছর বয়সে সিরিয়ার বিপ্লবে অংশ নেয়। তাদের বন্ধুত্ব ও আদর্শের ভিত্তি তখনই গড়ে ওঠে, যা পরবর্তী বছরগুলোতে তাদের পথচলাকে প্রভাবিত করে।
সিরিয়ার বিপ্লবে অংশগ্রহণের পর, দুই বন্ধু বহু বছর নির্বাসনে কাটায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা ইউরোপের বিভিন্ন শহরে বসবাস করে, তবে তাদের স্বপ্ন ও স্মৃতি কখনো ম্লান হয় না। এই অভিজ্ঞতা তাদেরকে নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে।
বেরলিনের রাস্তায় নাবিল ও কুসাইকে দেখা যায়, যেখানে তারা ফিলিস্তিনের জন্য ন্যায়বিচার দাবি করে প্রতিবাদে অংশ নেয়। এই দৃশ্যটি চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যেখানে ব্যক্তিগত ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের সংযোগ স্পষ্ট হয়।
আসাদ সরকারের পতনের পর, নাবিল তার জন্মভূমিতে ফিরে যায়। তবে ফিরে এসে তিনি একটি অস্থির নতুন শাসনব্যবস্থার মুখোমুখি হন, যেখানে নিরাপত্তা ও স্বস্তি এখনও অনিশ্চিত। এই অংশটি সিরিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার একটি সূক্ষ্ম চিত্র তুলে ধরে।
চলচ্চিত্রের উৎপাদন কাজটি র্যান্ড আবু ফাখ ও রোজা গালগুয়েরা অর্টেগা একসাথে পরিচালনা করেছেন, এবং বেলজিয়ামের হিলাইফ সিনেমাটোগ্রাফি এই প্রকল্পের মূল উৎপাদন সংস্থা। হ্যান্স ব্রুচ ছবির চিত্রগ্রহণে দায়িত্ব পালন করেছেন, এবং হিলাইফ সিনেমাটোগ্রাফি বিক্রয় কাজের দায়িত্বে রয়েছে।
নির্দেশক এই কাজের মাধ্যমে নির্বাসনের অভিজ্ঞতা, অতীত ও বর্তমানের সংযোগ, এবং স্বপ্ন ও স্মৃতির সমন্বয়কে একত্রে প্রকাশ করতে চেয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, মানুষের জীবনে স্থানান্তরের অনুভূতি কিভাবে অতীতের ছায়া ও ভবিষ্যতের আশার সঙ্গে মিশে যায়, তা এই চলচ্চিত্রের মূল থিম।
চলচ্চিত্রে অলিভ গাছকে একটি পুনরাবৃত্তিমূলক দৃশ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। অলিভ গাছ সিরিয়ার গ্রামীণ জীবনের প্রতীক, এবং তার শিকড় ও ফলের মাধ্যমে স্থায়িত্ব ও শান্তির ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। এই ভিজ্যুয়াল উপাদানটি গল্পের গভীরতা বাড়িয়ে তুলেছে।
চলচ্চিত্রের মূল বার্তা হল, সূক্ষ্ম ও আন্তরিক মুহূর্তগুলোও রেডিক্যাল প্রতিরোধের রূপ নিতে পারে। বন্ধুত্ব, প্রেম ও মানবিক সংবেদনশীলতা যখন দমিয়ে রাখা হয়, তখন সেগুলোই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবাদ হয়ে ওঠে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে চলচ্চিত্রটি দর্শকের হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলেছে।
রটারড্যামের “ব্রাইট ফিউচার” প্রোগ্রামে বিশ্বপ্রিমিয়ার পাওয়া চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক সমালোচকদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে। দর্শকরা বিশেষ করে এর স্বপ্নময় চিত্রকল্প ও বাস্তব ঘটনার মিশ্রণকে প্রশংসা করেছেন, যা সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করে।
চলচ্চিত্রের পর র্যান্ড আবু ফাখ ভবিষ্যতে নতুন প্রকল্পের পরিকল্পনা করছেন, যদিও সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু এখনো প্রকাশিত হয়নি। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, নির্বাসনের থিম এবং মানবিক সংযোগের অনুসন্ধান তার পরবর্তী কাজের মূল দিক হবে।
সারসংক্ষেপে, “Why Do I See You in Everything?” সিরিয়ার যুদ্ধ, নির্বাসন এবং মানবিক প্রতিরোধের একটি সূক্ষ্ম ও শক্তিশালী চিত্র তুলে ধরে। র্যান্ড আবু ফাখের এই প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্বীকৃতি পেয়ে সিরিয়ার গল্পকে বিশ্ব মঞ্চে নতুন আলোতে উপস্থাপন করেছে।



