ভেমা হাইড্রোজেন কোম্পানি কুইবেকের ভূগর্ভস্থ রিজার্ভার থেকে হাইড্রোজেন উৎপাদনের পাইলট প্রকল্প শেষ করেছে এবং আগামী বছর প্রথম বাণিজ্যিক কূপ ড্রিলের পরিকল্পনা জানিয়েছে। কোম্পানির লক্ষ্য হল এক কিলোগ্রাম হাইড্রোজেনের দাম এক ডলারের নিচে নামিয়ে আনা, যা পরিষ্কার শক্তির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান হিসেবে স্বীকৃত। এই দামের হ্রাস ডেটা সেন্টার এবং অন্যান্য শিল্পের জন্য হাইড্রোজেনকে সাশ্রয়ী জ্বালানি বিকল্প করে তুলতে পারে, ফলে ভবিষ্যতে এই সুবিধাগুলোর অবস্থানেও পরিবর্তন আসতে পারে।
গাড়ি শিল্পে হাইড্রোজেনের ব্যাপক ব্যবহার এখনও সীমাবদ্ধ, তবে শিল্পখাত ও ডেটা সেন্টারগুলোতে হাইড্রোজেনের চাহিদা বাড়ছে। ভেমা হাইড্রোজেনের এই পদ্ধতি ভূগর্ভে থাকা লৌহ-সমৃদ্ধ শিলায় পানি, তাপ, চাপ ও নির্দিষ্ট ক্যাটালিস্ট প্রয়োগের মাধ্যমে গ্যাস মুক্ত করে, যা পরে পৃষ্ঠে টেনে আনা হয় এবং শিল্প গ্রাহকদের বিক্রি করা হয়।
ডিসেম্বরে কোম্পানি ক্যালিফোর্নিয়ার ডেটা সেন্টারগুলোকে হাইড্রোজেন সরবরাহের চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। এই চুক্তি হাইড্রোজেনকে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ সরবরাহের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনা তুলে ধরেছে, বিশেষ করে যখন ঐ অঞ্চলে শক্তি খরচ বাড়ছে।
কুইবেকের পাইলট প্রকল্পে ভেমা হাইড্রোজেন নির্দিষ্ট ধরনের লৌহ-সমৃদ্ধ শিলায় কূপ ড্রিল করে, যেখানে পানির সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন হয়। এই প্রক্রিয়ায় গ্যাসের উৎপাদনকে ত্বরান্বিত করতে তাপ ও চাপের পাশাপাশি কিছু ক্যাটালিস্টের ব্যবহার করা হয়। উৎপন্ন হাইড্রোজেনকে পৃষ্ঠে টেনে আনা হয় এবং স্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরবরাহ করা হয়।
কুইবেকের স্থানীয় বাজারের বার্ষিক প্রয়োজনীয়তা প্রায় ১০ লক্ষ টন হাইড্রোজেন, যা পূরণ করতে মাত্র তিন বর্গকিলোমিটার এলাকা প্রয়োজন হবে—এটি তুলনামূলকভাবে খুবই ছোট পরিসর। এই ছোট জমি ব্যবহার করে বড় পরিমাণ হাইড্রোজেন উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় ভেমা হাইড্রোজেনের মডেলকে স্কেলযোগ্য বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রথম পাইলট কূপ থেকে প্রতিদিন কয়েক টন হাইড্রোজেন উৎপাদনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। পরবর্তী বছর কোম্পানি ৮০০ মিটার গভীরতায় প্রথম বাণিজ্যিক কূপ ড্রিল করার পরিকল্পনা করেছে, যা বৃহত্তর উৎপাদন ক্ষমতা নিশ্চিত করবে। এই কূপের মাধ্যমে হাইড্রোজেনের উৎপাদন খরচ এক কিলোগ্রাম প্রতি এক ডলারের নিচে নামানোর লক্ষ্য রয়েছে।
বর্তমানে হাইড্রোজেনের বেশিরভাগ উৎপাদন মিথেনের বাষ্প রিফর্মেশন (SMR) নামে পরিচিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়। এই পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে মিথেনকে তাপ ও বাষ্পের সাহায্যে ভেঙে হাইড্রোজেন আলাদা করা হয়, যা প্রচুর পরিমাণে শক্তি ব্যবহার করে এবং একই সঙ্গে কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গত করে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) অনুযায়ী SMR পদ্ধতিতে উৎপাদিত হাইড্রোজেনের দাম ৭০ সেন্ট থেকে ১.৬ ডলার প্রতি কিলোগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে।
SMR প্রক্রিয়ায় কার্বন ক্যাপচার প্রযুক্তি যুক্ত করলে খরচ প্রায় অর্ধেক বৃদ্ধি পায়, ফলে হাইড্রোজেনের চূড়ান্ত দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। অন্যদিকে, শূন্য-কার্বন বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ইলেক্ট্রোলাইসার চালিয়ে হাইড্রোজেন উৎপাদনের পদ্ধতি পরিবেশের জন্য সবচেয়ে পরিষ্কার, তবে এর খরচ বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়।
ভেমা হাইড্রোজেনের পদ্ধতিকে “স্টিমুলেটেড জিওলজিকাল হাইড্রোজেন” বা “ইঞ্জিনিয়ার্ড মিনারাল হাইড্রোজেন” বলা হয়। অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের গবেষণা অনুযায়ী এই পদ্ধতি বর্তমানে পরিচিত সবচেয়ে পরিষ্কার হাইড্রোজেন উত্সের একটি হতে পারে। শিলায় স্বাভাবিকভাবে সঞ্চিত হাইড্রোজেনকে কৃত্রিমভাবে সক্রিয় করে উৎপাদন করা হয়, ফলে অতিরিক্ত কার্বন নির্গমন না করে বড় পরিমাণে গ্যাস পাওয়া সম্ভব।
প্রযুক্তি পরিমার্জিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেমা হাইড্রোজেনের সিইও পিয়ের লেভিন এক কিলোগ্রাম প্রতি ৫০ সেন্টের নিচে হাইড্রোজেন উৎপাদনের লক্ষ্য প্রকাশ করেছেন। এই দামের স্তরে হাইড্রোজেনের ব্যবহার শিল্পখাতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে, বিশেষ করে ডেটা সেন্টারগুলোতে যেখানে বিদ্যুৎ খরচের ওপর চাপ বাড়ছে। সাশ্রয়ী ও পরিষ্কার হাইড্রোজেনের সরবরাহ ডেটা সেন্টারকে বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে, দূরবর্তী বা কম বিদ্যুৎ সুবিধাযুক্ত এলাকায় স্থাপনকে সহজ করবে।
সারসংক্ষেপে, ভেমা হাইড্রোজেনের ভূগর্ভস্থ হাইড্রোজেন উৎপাদন মডেল হাইড্রোজেনের খরচকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে, শিল্প ও ডেটা সেন্টার খাতে নতুন জ্বালানি বিকল্প তৈরি করতে পারে। যদি এক কিলোগ্রাম হাইড্রোজেনের দাম ৫০ সেন্টের নিচে পৌঁছে যায়, তবে হাইড্রোজেনকে বিদ্যুৎ বিকল্প হিসেবে গ্রহণের হার দ্রুত বাড়বে, যা জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।



