ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার মাঝেই রাশিয়া কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রভাবিত করতে পারে, তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ইউক্রেনের সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানের নিরাপত্তা ও পারমাণবিক কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ নিয়ে মস্কোর মধ্যস্থতা বাড়ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে চুক্তি করার আশাবাদ প্রকাশ করেন এবং সাংবাদিকদের জানিয়ে দেন যে তেহরানের সাথে সমঝোতা সম্ভব হতে পারে। একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে প্যাট্রিয়ট ও থাড ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা স্থাপন করে, তবে ইরানে কোনো তাৎক্ষণিক আক্রমণের পরিকল্পনা নেই বলে জানানো হয়েছে।
কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মতে, রাশিয়া, তুরস্ক এবং কাতারের সমন্বয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন আলোচনার দরজা খুলে গেছে। মস্কোতে ইরানের নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজনি ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠকের পর ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের পরিকল্পনা থেকে কিছুটা সরে যাওয়া লক্ষ্য করা গেছে।
রাশিয়ার প্রস্তাব অনুযায়ী, রাশিয়ার পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম ইরানের বেসামরিক পারমাণবিক কার্যক্রম তদারকি করবে, যাতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকে। রাশিয়ার মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ উল্লেখ করেন যে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির মতোই একটি কার্যকর সমাধান মস্কো প্রদান করতে প্রস্তুত।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের মধ্যে, রাশিয়ার এই উদ্যোগকে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাশিয়া, তুরস্ক ও কাতারকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করে তেহরান ও ওয়াশিংটনকে সরাসরি সংলাপে আনতে চাওয়া হচ্ছে, যা পূর্বে সীমিত যোগাযোগের মাধ্যমে সম্ভব হয়নি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বাড়লেও, ইরানের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি না থাকায় ট্রাম্পের কথায় আশাবাদী সুর দেখা যায়। তবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ও থাড সিস্টেমের মোতায়েন ইরানের সীমান্তে অতিরিক্ত নিরাপত্তা স্তর যোগ করেছে, যা ভবিষ্যতে কোনো অপ্রত্যাশিত উত্তেজনা এড়াতে সহায়ক হতে পারে।
রাশিয়ার পারমাণবিক তদারকি প্রস্তাবের সঙ্গে সঙ্গে, রাশিয়া ইরানের বেসামরিক পারমাণবিক সুবিধার ওপর নজরদারি বাড়াবে বলে জানিয়েছে। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণকে আন্তর্জাতিক মানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা, যাতে পারমাণবিক অস্ত্রের বিকাশের ঝুঁকি কমে।
ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার অগ্রগতি রাশিয়ার কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায়, মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিবেশে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। রাশিয়া, তুরস্ক ও কাতারকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন সংলাপের পথ তৈরি করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে, রাশিয়ার এই উদ্যোগের সফলতা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যদি রাশিয়া ও ইরানের পারস্পরিক তদারকি ব্যবস্থা কার্যকর হয়, তবে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির মতোই একটি স্থায়ী সমঝোতা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানের নিরাপত্তা সংক্রান্ত স্পষ্ট পরিকল্পনার অভাবের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা হবে কিনা, তা ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারকদের জন্য চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। ট্রাম্পের আশাবাদী মন্তব্যের পরেও, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক পদক্ষেপে রাশিয়ার ভূমিকা কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তা এখনও অনিশ্চিত।
এই কূটনৈতিক গতি-প্রকৃতির পরবর্তী ধাপ হিসেবে, রাশিয়া, তুরস্ক ও কাতারকে অন্তর্ভুক্ত করে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন আলোচনার সেশন পরিকল্পনা করা হচ্ছে। উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা পরবর্তী সপ্তাহে মস্কোতে পুনরায় মিলিত হতে পারে, যেখানে পারমাণবিক তদারকি ও নিরাপত্তা গ্যারান্টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
সারসংক্ষেপে, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য চুক্তি আলোচনার মধ্যে রাশিয়ার সক্রিয় ভূমিকা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে পুনর্গঠন করতে পারে। রাশিয়ার পারমাণবিক তদারকি প্রস্তাব, তুরস্ক ও কাতারের মধ্যস্থতা, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি একসাথে কাজ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। এই প্রক্রিয়া যদি সফল হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা হ্রাস পেতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদী শান্তির সম্ভাবনা উন্মোচিত হতে পারে।



