ইরানের সরকারবিরোধী প্রতিবাদে অংশগ্রহণের অভিযোগে তাসনিমের তথ্য অনুযায়ী, দেশে কমপক্ষে ১৩৯ বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারের ঘোষণা মঙ্গলবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসনিম প্রকাশ করেছে। গ্রেফতারের কারণ হিসেবে দাঙ্গামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহ উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও গ্রেফতারের ব্যক্তিদের জাতীয়তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
ইরানের ইয়াজদ শহরের পুলিশ প্রধান আহমাদ নেগাহবান জানান, গ্রেফতারকৃতদের বেশিরভাগই দাঙ্গা-সংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক দাঙ্গাকারীদের সঙ্গে সম্পর্কিত মামলাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এই ১৩৯ জনের সবই বিদেশি নাগরিক।
বিক্ষোভের সূচনা ২৮ ডিসেম্বর থেকে, যখন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা অবনতি ঘটছিল এবং মুদ্রার মান দ্রুত হ্রাস পাচ্ছিল। তেহরানের সরকার এই অস্থিরতাকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বা ‘দাঙ্গা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও সাধারণ পথচারীদের ওপর আক্রমণকে বিশেষভাবে নিন্দা করেছে।
সরকারের মতে, এই অস্থিরতায় তিন হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। তবে সরকার দাবি করে যে, মৃতদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও সাধারণ নাগরিক, যা তাদের দাঙ্গা-সংশ্লিষ্টতা নির্দেশ করে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (HRAN) এই সংখ্যাকে ৬,৮৫৪ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেখেছে। অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থাগুলিও ইঙ্গিত দিয়েছে যে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা সরকারী পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি হতে পারে।
ইরানের অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে, দামের দ্রুত বৃদ্ধি এবং বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়ায় জনগণের অসন্তোষ বাড়ছে। এই পরিস্থিতি সরকারবিরোধী প্রতিবাদকে ত্বরান্বিত করেছে, যা নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েছে।
গ্রেফতারের পর, ইরানের নিরাপত্তা বিভাগ দাঙ্গা-সংশ্লিষ্ট অপরাধের তদন্তকে ত্বরান্বিত করার কথা জানিয়েছে। তারা উল্লেখ করেছে, ভবিষ্যতে বিদেশি নাগরিকদের ওপর আরও কঠোর নজরদারি চালু হবে, যাতে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকি না বাড়ে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, এই ধরনের বৃহৎ পরিসরের গ্রেফতার সরকারকে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে ফেলতে পারে, বিশেষ করে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছ থেকে। তবে ইরান সরকার এখনও বিদেশি নাগরিকদের পরিচয় প্রকাশ না করে, যা তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
অধিকন্তু, এই গ্রেফতার ফলে ইরানের বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশে প্রভাব পড়তে পারে। বিদেশি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপত্তা ও আইনি ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে পারে, যা দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, সরকারবিরোধী প্রতিবাদ এবং তার পরিণতিতে নেওয়া কঠোর পদক্ষেপগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যকে পুনর্গঠন করতে পারে। নিরাপত্তা বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি এবং বিদেশি নাগরিকদের ওপর কঠোর নিয়মাবলী সরকারকে জনমত নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে, তবে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ককে জটিল করতে পারে।
ইরানের সরকার এখনো গ্রেফতারের পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়নি। তবে নিরাপত্তা বিভাগ নিশ্চিত করেছে, সংশ্লিষ্ট সকল মামলাকে দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য আদালতে উপস্থাপন করা হবে।
সামগ্রিকভাবে, ইরানে চলমান অর্থনৈতিক সংকট, দাঙ্গা-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সংখ্যা এবং বিদেশি নাগরিকদের ব্যাপক গ্রেফতার দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে এই ঘটনাগুলোর প্রভাব কীভাবে প্রকাশ পাবে, তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে থাকবে।



