ইরাকের এক সশস্ত্র গোষ্ঠী, যা ২০২০ সালে জেনারেল কাসেম সোলাইমানি ও আবু মাহদি আল‑মুহান্দিসের হত্যার পর গঠিত হয়, সম্প্রতি তাদের অস্ত্রশস্ত্র ও কার্যক্রমের বিশদ প্রকাশ করেছে। গোষ্ঠীটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির বিরোধিতা করে এবং গাজা যুদ্ধের সূচনার পর “আকসা‑ওয়ান” নামের মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সফল ব্যবহার ঘোষণা করেছে।
গোষ্ঠীর গঠন ও লক্ষ্য সম্পর্কে জানানো হয়েছে যে, ২০২০ সালে দুই উচ্চপদস্থ ইরাকি কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পরই এই সংগঠনটি গড়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে তারা ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও কার্যক্রমের বিরোধিতা করে আসছে এবং ইরানের সমর্থনে কাজ করছে। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিকট ইস্ট পলিসির এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই গোষ্ঠীই আল‑আসাদ ও হারির ঘাঁটিতে সংঘটিত হামলার পেছনে ছিল।
অস্ত্রের দিক থেকে গোষ্ঠীটি ইরানের সরবরাহকৃত জিলজাল ও ফজর রকেটের পাশাপাশি নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি “বাতার” এবং “সালাম‑ওয়ান” ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। গাজা যুদ্ধের প্রারম্ভে তারা “আকসা‑ওয়ান” নামে মাঝারি দূরত্বের ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উৎক্ষেপণ ঘোষণা করে, যা তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার নতুন স্তর নির্দেশ করে। এই প্রকাশনা যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য অপ্রত্যাশিত আঘাত স্বরূপ, কারণ দুই দশক ধরে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি ও আধুনিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও এত বড় ভূগর্ভস্থ অস্ত্রাগার গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
আঞ্চলিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে, ইরাকের এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখন কেবল ইরানের নীতির অনুসারী নয়, বরং স্বতন্ত্রভাবে সিদ্ধান্ত নিতে ও আক্রমণ চালাতে সক্ষম। বিশেষ করে বদর অর্গানাইজেশন, হেজবুল্লাহ ব্রিগেড এবং আল‑নুজাবা মুভমেন্টের মতো শক্তিশালী দলগুলো ইরানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে প্রস্তুতির কথা প্রকাশ করেছে। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, কোনো বৃহত্তর সংঘাতের উদ্ভব হলে ইরাকের ভূমিকা কেবল মধ্যস্থতাকারী নয়, বরং সক্রিয় ও বিধ্বংসী হতে পারে।
গোষ্ঠীর প্রকাশ্য অবস্থান ও অস্ত্রের বিবরণে দেখা যায়, তারা ইরানের সরবরাহের পাশাপাশি নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতা গড়ে তুলেছে। ইরানের তৈরি রকেটের পাশাপাশি দেশীয়ভাবে তৈরি “বাতার” ও “সালাম‑ওয়ান” ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার ইরাকের সামরিক শিল্পের স্বনির্ভরতা বাড়াচ্ছে। গাজা যুদ্ধের পর “আকসা‑ওয়ান” এর সফল ব্যবহার গোষ্ঠীর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে আরও দৃঢ় করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই গোষ্ঠীর ভূগর্ভস্থ সুবিধা ও অস্ত্রশস্ত্রের গোপনীয়তা কীভাবে বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে তা নিয়ে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। ইরাকের ভূগর্ভস্থ কাঠামো ও গোপনীয়তা বজায় রাখার পদ্ধতি, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারির সীমাবদ্ধতা, ভবিষ্যতে নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
গোষ্ঠীর প্রকাশ্য বিরোধিতা ও অস্ত্রের উন্নয়ন ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিবিদ্যায়ও প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করেন। ইরানের প্রতি সম্পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে গোষ্ঠীটি ইরাকের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নতুন শক্তি হিসেবে উদ্ভাসিত হচ্ছে, যা সরকার ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে সমন্বয় ও সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
ভবিষ্যতে ইরাকের নিরাপত্তা কাঠামো ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর এই গোষ্ঠীর কার্যক্রমের প্রভাব বিশাল হতে পারে। যদি ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো স্বতন্ত্রভাবে আক্রমণ চালাতে সক্ষম হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য ইরাকের ভূখণ্ডে নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। একই সঙ্গে, ইরানের সঙ্গে ইরাকের সম্পর্কের জটিলতা বাড়বে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিবেশকে প্রভাবিত করবে।
সারসংক্ষেপে, ইরাকের এই নতুন মিসাইল গোষ্ঠী প্রকাশ্যে তাদের অস্ত্রশস্ত্র ও কার্যক্রমের বিবরণ শেয়ার করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে এবং ইরাকের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত রাজনৈতিক গতিবিদ্যায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভবিষ্যতে গোষ্ঠীর স্বায়ত্তশাসন ও ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কীভাবে বিকশিত হবে, তা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে থাকবে।



