ডেনমার্কে সম্প্রতি পরিচালিত একটি জরিপে প্রকাশ পেয়েছে, দেশের প্রায় ষাট শতাংশ নাগরিক মার্কিন সরকারকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করছেন। জরিপটি ডিআর, ড্যানিশ রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় এবং ফলাফল ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর নিরাপত্তা সম্পর্কের নতুন দৃষ্টিকোণ উন্মোচন করেছে। এই তথ্য ডেনমার্কের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নীতি আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জরিপের প্রশ্ন ছিল, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিবেশে মার্কিন সরকারকে মিত্র না শত্রু হিসেবে দেখা হয় কিনা। উত্তরদাতাদের মধ্যে মাত্র সতেরো শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রকে মিত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা পূর্বের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হ্রাস নির্দেশ করে। বাকি অংশের বেশিরভাগই শত্রু বা অনিশ্চিত অবস্থানে রয়েছে।
বিশেষ করে বিশ শতাংশ উত্তরদাতা জানেন না, আর তিন শতাংশ কোনো উত্তর দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন। এই অনিশ্চয়তা ও অস্বীকৃতি ডেনমার্কের জনমতকে আরও জটিল করে তুলেছে, কারণ এটি নিরাপত্তা নীতি গঠনে স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে না।
ডেনমার্ক ন্যাটোর সক্রিয় সদস্য এবং গ্রিনল্যান্ডকে ন্যাটো নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে গণ্য করে। ন্যাটো চুক্তির ধারা অনুযায়ী, কোনো সদস্য দেশ আক্রমণের শিকার হলে বাকি সব সদস্য সামরিক সহায়তা প্রদান করতে বাধ্য। তবে চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই যে এক সদস্য অন্য সদস্যকে আক্রমণ করলে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে। এই ফাঁকটি ডেনমার্কের জনমতকে আরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্বের প্রেক্ষাপটে।
মার্কিন সরকার প্রধানের (ডোনাল্ড ট্রাম্প) পূর্বে গ্রিনল্যান্ড দখল করার ইচ্ছা প্রকাশের পর ডেনমার্কের জনমত দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক সম্পদ ও আর্কটিক কৌশলগত অবস্থানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবি ডেনমার্কের নিরাপত্তা উদ্বেগকে তীব্র করেছে। ফলে, জরিপে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত শতাংশের বৃদ্ধি এই রাজনৈতিক উত্তেজনার সরাসরি ফলাফল বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
ন্যাটো চুক্তির ধারা পাঁচ (Article 5) অনুযায়ী, কোনো সদস্যের ওপর আক্রমণ হলে সমগ্র জোটের সামরিক প্রতিক্রিয়া বাধ্যতামূলক। তবে এক সদস্য অন্য সদস্যকে আক্রমণ করলে কী হবে, তা চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই, ফলে এমন পরিস্থিতিতে জোটের অভ্যন্তরীণ সংহতি পরীক্ষা করা হবে। এই অনিশ্চয়তা ডেনমার্কের নিরাপত্তা নীতিতে নতুন প্রশ্ন তুলেছে, বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ডের রক্ষা সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিগুলো কীভাবে বজায় থাকবে তা নিয়ে।
ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত হুমকি ন্যাটোর অভ্যন্তরে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল, যা জোটের ঐক্যকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারত। তবে জানুয়ারি মাসে ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তন হওয়ায় তীব্র উত্তেজনা কিছুটা কমে এসেছে।
এই পরিবর্তন সত্ত্বেও, জরিপের ফলাফল ডেনমার্কের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। জনমতের এই প্রবণতা ন্যাটো সভায় ডেনমার্কের অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে, বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ডের সুরক্ষা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হলে।
ডেনমার্কের সরকার এখনও মার্কিন সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তবে জনমত পরিবর্তন কূটনৈতিক আলোচনায় নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসবে। ন্যাটো সদস্য দেশগুলোকে এই ধরনের জনমত প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করে যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির পুনর্গঠন বা শক্তিশালীকরণে কাজ করতে হবে।
ভবিষ্যতে, ডেনমার্কের রাজনৈতিক নেতারা ন্যাটোর অভ্যন্তরে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত শতাংশের বৃদ্ধি কীভাবে সামাল দেবেন, তা নিয়ে কৌশল নির্ধারণের প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের আর্কটিক নীতি ও গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা পুনরায় চালু হতে পারে। ন্যাটো জোটের সংহতি বজায় রাখতে, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস পুনর্নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে।



