ভারত সরকার ২ ফেব্রুয়ারি সোমবার কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের ঘোষণার পর শিলিগুড়ি করিডোরে ভূগর্ভস্থ রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। এই প্রকল্পটি উত্তর-পূর্ব ভারতের বাকি অংশকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি রেল সংযোগের মাধ্যমে যুক্ত করার লক্ষ্য রাখে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভূগর্ভস্থ রেলপথটি শিলিগুড়ি করিডোরের সংকীর্ণ অংশে স্থাপন করা হবে, যা আন্তর্জাতিক পরিবহন নেটওয়ার্কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শিলিগুড়ি করিডোর, যা “চিকেন নেক” নামে পরিচিত, প্রায় ২৫ কিলোমিটার প্রশস্ত এবং সীমান্তের নিকটবর্তী একটি সংকীর্ণ ভূখণ্ড। এই সীমিত স্থানিক প্রস্থের কারণে উপরে সরাসরি রেললাইন স্থাপন করা কঠিন, ফলে সরকার ভূগর্ভস্থ বিকল্পকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। ভূগর্ভস্থ রেলপথের মাধ্যমে ট্রাফিকের নিরাপত্তা ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা যাবে, বিশেষ করে সীমান্তের অস্থিরতা বাড়লে।
বাজেটের মধ্যে এই অঞ্চলের রেল সংযোগকে চার ট্র্যাক পর্যন্ত সম্প্রসারণের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অতিরিক্ত ট্র্যাকের পরিকল্পনা ভবিষ্যতে ট্রেনের গতি ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে, যা বাণিজ্যিক ও যাত্রী পরিবহনের চাহিদা মেটাতে সহায়ক হবে। সরকার এই ধাপকে দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজার চেতন শ্রীবাস্তবের মতে, ভূগর্ভস্থ অংশটি হাট থেকে বাংলার রাঙ্গাপানি স্টেশন পর্যন্ত প্রায় তিন মাইল (প্রায় ৪.৮ কিলোমিটার) বিস্তৃত হবে। এই সেকশনটি মূলত করিডোরের সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশে গড়ে তোলা হবে, যেখানে পৃষ্ঠে রেললাইন স্থাপন করা কঠিন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ভূগর্ভস্থ লাইনটি আধুনিক টানেলিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্মিত হবে।
কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে, শিলিগুড়ি করিডোরের এই অংশটি দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংযোগের জন্য এক ধরনের “অচিলিস হিল” হিসেবে বিবেচিত হয়। অর্থাৎ, শক্তিশালী সামগ্রিক কাঠামোর মধ্যে একটি একক দুর্বল লিঙ্কের মতো। সরকার এই লিঙ্ককে মজবুত করতে ভূগর্ভস্থ রেললাইনকে কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে, শিলিগুড়ি করিডোরের এই প্রকল্পটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। হাশিনা সরকারের পতনের পর, কিছু বিশ্লেষক এই রেললাইনকে ভারতের অঞ্চলে প্রভাব বাড়ানোর উপায় হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। তবে, দু’দেশের মধ্যে চলমান দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় এই প্রকল্পের নিরাপত্তা ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
একজন সরকারি কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, সংকটের সময়েও রেল সংযোগ বজায় রাখা দেশের কৌশলগত স্বার্থের অংশ। ভূগর্ভস্থ রেললাইনটি এমন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে, যখন সীমান্তে অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে বা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়বে। এই পদক্ষেপটি দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিবহন নেটওয়ার্কের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের বাস্তবায়ন ধাপের মধ্যে টানেলিং কাজের অনুমোদন, পরিবেশগত অনুমোদন এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সমন্বয় অন্তর্ভুক্ত। রেলমন্ত্রীর অফিস আগামী মাসে বিস্তারিত প্রকল্প পরিকল্পনা প্রকাশের কথা জানিয়েছে, যা নির্মাণের সময়সূচি ও আর্থিক ব্যয় নির্ধারণ করবে। সফলভাবে সম্পন্ন হলে, শিলিগুড়ি করিডোরের ভূগর্ভস্থ রেললাইন উত্তর-পূর্ব সংযোগ ও নিরাপত্তা জোরদার করবে, এবং ভারতের আঞ্চলিক কৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করবে।



