ডেভোসের বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কতা জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করবে না এবং অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা এখন চাপের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এই বক্তব্য ফোরামের শীর্ষস্থানীয় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিস্তৃত আলোচনার সূচনা করে।
কার্নি বলেন, একসময় একীভূত বিশ্বে সহযোগিতা স্বাভাবিক ছিল, তবে এখন সরবরাহ শৃঙ্খলগুলোকে রাজনৈতিক চাপে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে মধ্যম শক্তিগুলোকে দুর্বল অবস্থান থেকে আলোচনায় অংশ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। তিনি কোনো নতুন নীতি বা কৌশল উপস্থাপন না করেও, বর্তমান শৃঙ্খলার অবনতি ও ক্ষমতার পুনর্গঠনকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোনও একই ফোরামে ইউরোপের কৌশলগত নির্ভরতা সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, যুদ্ধোত্তর গ্লোবাল শাসন কাঠামো একতরফা পদক্ষেপ, জবরদস্তি ও ভূ-রাজনৈতিক অবিশ্বাসের কারণে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। ম্যাক্রোনের বক্তব্যের পর ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে জরুরি সমাবেশের আহ্বান জানানো হয়।
ইউরোপীয় জরুরি সম্মেলনটি ডেভোসের পরপরই অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে মহাদেশের কৌশলগত ঝুঁকি ও বহুপাক্ষিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়। এই সমাবেশের আয়োজনই স্বয়ংই বহুপাক্ষিকতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ না করার স্বীকৃতি হিসেবে দেখা যায়। নেতারা সম্মত হন, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে সক্রিয় পদক্ষেপ প্রয়োজন।
কার্নি এবং ম্যাক্রোনের মন্তব্যের মূল বিষয় হল, একতরফা শাসন ও অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে শক্তি পুনর্বণ্টন হচ্ছে। তারা উভয়ই উল্লেখ করেন, পুরনো শৃঙ্খলা এখন ‘বিচ্ছিন্ন’ অবস্থায় এবং তা ‘পরিবর্তন’ নয়, ‘ভাঙন’ হিসেবে বিবেচিত। এই দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন পর্যায়ের সূচক হতে পারে।
মিডল পাওয়ার দেশগুলো, যেমন কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া, এখন সরবরাহ শৃঙ্খলকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা দেশগুলোর থেকে চাপের মুখে। তাদের জন্য এখন কূটনৈতিক সমঝোতা ও নিরাপত্তা গ্যারান্টি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিবেশকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
ডেভোসে উল্লিখিত উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান দেশগুলো দ্রুত সমন্বয়মূলক পদক্ষেপ নিতে চায়। তারা একতরফা নীতি ও শাসন কাঠামোর পুনর্গঠন, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং বহুপাক্ষিক সংলাপের পুনরায় সক্রিয়করণে মনোযোগ দিচ্ছে।
বিশ্বের অন্যান্য প্রধান শক্তি, যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন, এই আলোচনার প্রেক্ষাপটে কী ভূমিকা রাখবে তা এখনও অনিশ্চিত। তবে ডেভোসে উন্মোচিত মতবিনিময় স্পষ্ট করে যে, আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠনের জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন, একক দেশ বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়।
এই ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন দিকনির্দেশনা নির্দেশ করে। বহুপাক্ষিকতা যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ না করে, তবে দেশগুলোকে সক্রিয়ভাবে সংলাপ ও সহযোগিতা গড়ে তুলতে হবে। ডেভোসের এই মুহূর্তটি, শীর্ষ নেতাদের সতর্কতা ও জরুরি সমাবেশের মাধ্যমে, ভবিষ্যতের বৈশ্বিক শাসন কাঠামোর পুনর্গঠনের সূচনা হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ডেভোসে কানাডা ও ফ্রান্সের নেতারা আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার ভাঙনের ঝুঁকি ও মধ্যম শক্তিগুলোর দুর্বল অবস্থান তুলে ধরেছেন। তাদের সতর্কতা ইউরোপীয় জরুরি সম্মেলনে পরিণত হয়েছে, যা বহুপাক্ষিকতার পুনরুজ্জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের সূচনা চিহ্নিত করে। ভবিষ্যতে এই আলোচনার ফলাফল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



