বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ঢাকা শহরের কেন্দ্রীয় ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত “বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি” গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের উদ্যোগে এবং কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়।
গ্রন্থের রচয়িতা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, যিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা পদে নিযুক্ত, তার কাজের স্বীকৃতিতে এই উন্মোচন সমাবেশের আয়োজন করা হয়। তিনি নিজে উপস্থিত থেকে বইয়ের বিষয়বস্তু ও গবেষণার পদ্ধতি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেন।
আবু সায়ীদের ভাষণে তিনি জাতির গঠন প্রক্রিয়ার সময়সীমা নিয়ে তুলনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইংল্যান্ডের রাষ্ট্র গঠনে প্রায় আটশো বছর লেগেছে, আর বাংলাদেশ মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সী। তিনি বলেন, একটি বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য কোনো বিষয় বুঝতে দশ মিনিটই যথেষ্ট, কিন্তু একটি জাতিকে সম্পূর্ণভাবে জানার জন্য দশকের পর দশক দরকার। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার আহ্বান জানান।
তারপর তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের কিছু মূল পর্যায়ের দিকে ইঙ্গিত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৪৭ সালে একটি রাষ্ট্রের জন্ম হলেও তা আমাদের স্বপ্নের রাষ্ট্র ছিল না; এরপর ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৬৯ এবং ১৯৭১ সালের ঘটনাগুলোতে ধীরে ধীরে বর্তমান বাংলাদেশের রূপ গড়ে উঠেছে। স্বাধীনতার পর দশ বছর ধরে রাজনৈতিক হিংসা ও হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক শাসনের সূচনা হয়, যা দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
বক্তা তার স্বভাবসুলভ হাস্যরসের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের পরিবেশকে হালকা করেন। তিনি ব্যুরোক্রেটিক শিরোনাম “মহোদয়” নিয়ে রসিকতা করেন, বলেন যে এই ধরনের উপাধি ব্যবহার করা মানে নিজের গুরুত্বকে অতিরঞ্জিত করা, যখন প্রকৃত মহানতা নেই। এই রসিকতা শ्रोतাদের মধ্যে হাসি ফোটায় এবং আলোচনায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করে।
গ্রন্থের লেখকের ভাষা সম্পর্কে তিনি প্রশংসা ছাড়া থাকতে পারলেন না। তিনি বলেন, কবির খানের লেখনী সরল, সংক্ষিপ্ত এবং হৃদয়স্পর্শী, যা পাঠকের মনের গভীরে পৌঁছে আশা ও স্বপ্নের আলো জ্বালায়। এই ধরনের বর্ণনা দেশের সামাজিক সমস্যাগুলোকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি সমাধানের পথও নির্দেশ করে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুবউল্লাহ, অর্থনীতিবিদ ড. আসিফ নজরুল, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, দুদক (ডিজিটাল ইউজার ডেভেলপমেন্ট কমিশন) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। সকল উপস্থিতি একত্রে দেশের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ পেয়েছেন।
আবু সায়ীদের মন্তব্যগুলো দেশের রাজনৈতিক পরিপক্কতা ও প্রশাসনিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। তিনি দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিকোণ থেকে বলছেন, জাতির স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলতে সময়ের সাথে সাথে নীতি ও কাঠামোকে পুনর্গঠন করা আবশ্যক। এই দৃষ্টিভঙ্গি সরকারী সংস্থাগুলোর জন্য একটি রূপরেখা তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যেসব মন্ত্রণালয় ও কমিশন গ্রন্থের বিষয়বস্তুতে সরাসরি যুক্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুসারে, এই ধরনের বৌদ্ধিক সমাবেশগুলো নীতি নির্ধারকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াবে এবং আসন্ন সংসদীয় আলোচনায় প্রশাসনিক সংস্কার, সিভিল সার্ভিসের আধুনিকীকরণ এবং জাতীয় সংহতির বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে সহায়তা করবে। তাই, বই উন্মোচন অনুষ্ঠানটি শুধুমাত্র একটি প্রকাশনা উদযাপন নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে প্রয়োজনীয় দৃষ্টিভঙ্গি শেয়ার করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারসংক্ষেপে, আবু সায়ীদ এবং অন্যান্য বিশ্লেষকদের বক্তব্য দেশের গঠন প্রক্রিয়ার জটিলতা ও সময়সীমা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা প্রদান করেছে, যা নীতি নির্ধারক, গবেষক ও সাধারণ নাগরিকদের জন্য মূল্যবান রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে।



