১৩ জুলাই ২০০১, রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে জাতীয় সংসদে স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতির আদেশ পড়ে শোনালেন এবং সংসদ সমাপ্তির ঘোষণা দিলেন। একই মুহূর্তে বাংলাদেশ ৩০ বছর পূর্ণ করল এবং প্রথমবারের মতো একটি সংসদ পূর্ণ পাঁচ বছরের মেয়াদ সম্পন্ন করল।
স্পিকার আদেশের সঙ্গে সঙ্গে সংসদীয় রেকর্ডে এই দিনটি ইতিহাসের একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়। ১৯৯৬ সালের ১৩ জুলাই শুরু হওয়া সপ্তম জাতীয় সংসদ ঠিক পাঁচ বছর পর, ২০০১ সালের ১৩ জুলাই, একই সময়ে সমাপ্তি পেল।
সপ্তম সংসদের শুরুতে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ওয়াকআউট করেছিল এবং শেষের দিনেও উপস্থিত ছিল না। ফলে প্রথম তিন বছর সংসদ কিছুটা সক্রিয় থাকলেও, শেষ দেড় বছর বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে কার্যক্রম কমে যায়।
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে পূর্বে কোনো সংসদ পূর্ণ মেয়াদে পৌঁছায়নি। প্রথম সংসদ (১৯৭৩) আড়াই বছর টিকে, দ্বিতীয় (১৯৭৯) দুই বছর এগারো মাস, তৃতীয় (১৯৮৬) প্রায় এক বছর অর্ধ, চতুর্থ (১৯৮৮) দুই বছর সাত মাস পরে ১৯৯০-এ ভেঙে যায়, পঞ্চম (১৯৯১) চার বছর আট মাস এবং ষষ্ঠ (১৯৯৬) মাত্র বারো দিন টিকে।
সেই সময়ে শাসনকারী আওয়ামী লীগ পাঁচ বছরের পূর্ণতা উদযাপনের পরিকল্পনা করেছিল, তবে ১০ জুলাই স্পিকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী মৃত্যুর খবর এলে উৎসব বাতিল করা হয়। তখন দৈনিক ইত্তেফাকের কর্মী হিসেবে আমি সংসদ অধিবেশনের দৈনিক প্রতিবেদন লেখার দায়িত্বে ছিলাম এবং শেষ দিনের ঘটনাগুলোর সাক্ষীও হয়েছি।
অধিবেশনের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস হয়। রীতি অনুসারে সংসদ রাত ১২টা ১ মিনিটে অবসান ঘটে, ঠিক সেই সময়ে বিএনপি “আওয়ামী দুঃশাসনের অবসান” শিরোনামে দেশব্যাপী মহোৎসব ও বিজয় মিছিল আয়োজন করে।
পাঁচ বছর পূর্ণ হলেও সংসদে বিরোধী দলের অনুপস্থিতি এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বড় ঘটনার ফলে সেশনটি মসৃণ না বলে বিবেচিত হয়। ৬ মার্চ ১৯৯৯-এ যশোর টাউন হল ময়দানে বাংলাদেশ উদীচি শিল্পীগোষ্ঠীর দ্বাদশ সম্মেলনে বোমা বিস্ফোরণে দশজনের মৃত্যু হয়। একইভাবে ২০ জানুয়ারি ২০০১-এ ঢাকার পল্টনে সিপিবি সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়, যা নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়।
এই দুই বড় সন্ত্রাসী হামলা সংসদীয় মেয়াদে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়। যদিও আওয়ামী লীগ পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করার মাধ্যমে স্থিতিশীল শাসনের দাবি করে, তবে বিরোধী দলের দীর্ঘকালীন অব্যাহতি এবং সন্ত্রাসী আক্রমণগুলো পরবর্তী নির্বাচনের পরিবেশকে জটিল করে তুলতে পারে।
অবসর নেওয়া স্পিকার এবং বিরোধী দলের দীর্ঘ সময়ের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি করেছে, যা সরকারকে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংলাপের ক্ষেত্রে নতুন কৌশল গড়ে তুলতে বাধ্য করবে। আগামী নির্বাচনে বিরোধী দল সম্ভবত দ্রুত সময়সূচি দাবি করবে, আর সরকার পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করার রেকর্ডকে ভোটারদের কাছে তুলে ধরতে পারে।
সংসদ সমাপ্তির এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট পুনর্গঠন হচ্ছে; স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখবে।



