প্যারিসের ২০ বছর বয়সী এক ছাত্রের চোখে পড়া একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দ্বারা তৈরি ছবি, মেটা-তে এক মিলিয়নেরও বেশি লাইক পেয়ে ভাইরাল হওয়ার পর তিনি X (পূর্বে টুইটার নামে পরিচিত) এ “Insane AI Slop” নামে একটি অ্যাকাউন্ট চালু করেন।
সেই ছবি দুজন দুর্বল দক্ষিণ এশীয় শিশুকে দেখায়, যাদের মুখে শিশুসুলভ বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও ঘন দাড়ি রয়েছে। এক শিশুর কোনো হাত নেই এবং কেবল এক পা আছে, আর অন্যটি জন্মদিনের কেক ধরে একটি সাইন ধরে আছে, যেখানে লেখা আছে “এটা আমার জন্মদিন, লাইক দিন”। অপ্রত্যাশিতভাবে তারা বৃষ্টিতে ভেজা ব্যস্ত রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। ছবির গঠন, অস্বাভাবিক দাড়ি এবং অস্বাভাবিক পরিবেশের সমন্বয় AI‑এর চিহ্ন বহন করে, তবু মেটা-তে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ছবিটি এত দ্রুত প্রচারিত হওয়া এবং কোনো যাচাই ছাড়াই লক্ষ লক্ষ ব্যবহারকারীকে আকৃষ্ট করা থেওডোরের মধ্যে গভীর বিস্ময় সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, AI‑এর মাধ্যমে তৈরি অযৌক্তিক চিত্রগুলো মেটা-তে বিশাল সাড়া পায়, যা তার কাছে অযৌক্তিক ও অযাচিত মনে হয়।
এই ঘটনার পর থেওডোর “Insane AI Slop” নামে একটি X অ্যাকাউন্ট তৈরি করেন, যেখানে তিনি AI‑সৃষ্ট ভুয়া কন্টেন্টকে চিহ্নিত ও ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করেন। তার লক্ষ্য ছিল ব্যবহারকারীদের সতর্ক করা এবং এমন কন্টেন্টের বিস্তৃত প্রচার রোধ করা।
অ্যাকাউন্টটি চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে প্রচুর ভুয়া ছবি ও ভিডিও জমা হতে থাকে। থেওডোরের ইনবক্সে বিভিন্ন ধরনের AI‑সৃষ্ট কন্টেন্টের লিঙ্ক ও ফাইল পৌঁছায়, যা তিনি পর্যালোচনা করে তার অনুসারীদের সঙ্গে শেয়ার করেন।
পর্যালোচনার সময় দেখা যায় যে বেশিরভাগ ভুয়া কন্টেন্টে ধর্ম, সামরিক বিষয় বা দরিদ্র শিশুর হৃদয়স্পর্শী গল্পের মতো থিম পুনরাবৃত্তি হয়। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের শিশুরা কোনো না কোনো চমকপ্রদ কাজ করে এমন ছবি ও ভিডিওগুলো বেশি জনপ্রিয়তা পায়।
থেওডোরের মতে, দরিদ্র দেশের শিশুরা যখন চমকপ্রদ কাজ করে—যেমন আফ্রিকায় একটি বাচ্চা আবর্জনা থেকে বিশাল ভাস্কর্য তৈরি করা—তখন ব্যবহারকারীরা তা হৃদয়গ্রাহী মনে করে, ফলে সৃষ্টিকর্তারা একই রকম কন্টেন্ট তৈরি করে আরও মনোযোগ আকর্ষণ করতে চায়।
অ্যাকাউন্টটি দ্রুতই ১,৩৩,০০০ এর বেশি অনুসারী অর্জন করে, যা দেখায় যে AI‑সৃষ্ট ভুয়া কন্টেন্টের প্রতি জনসাধারণের উদ্বেগ বাড়ছে। থেওডোরের পোস্টগুলোতে ভুয়া ভিডিও ও ছবির উদাহরণ, সেগুলোর বিশ্লেষণ এবং কীভাবে সেগুলোকে চিহ্নিত করা যায় তা ব্যাখ্যা করা হয়।
থেওডোর AI‑স্লপকে সংজ্ঞায়িত করেন এমন ভুয়া, অপ্রতুল গুণমানের ছবি ও ভিডিও হিসেবে, যা স্বল্প সময়ে তৈরি হয় এবং বাস্তবতার কাছাকাছি না থাকলেও দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এই ধরনের কন্টেন্টের উৎপাদন ও শেয়ারিং এখন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলো AI‑এর ব্যবহার বাড়িয়ে তুললেও, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু প্রতিষ্ঠান AI‑স্লপের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি প্রয়োগের ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে মেটা সহ বেশিরভাগ সামাজিক নেটওয়ার্কে এখনও এই ধরনের কন্টেন্টের প্রবাহ সীমিত করা যায়নি।
বছরের পর বছর ধরে সামাজিক মিডিয়ার ব্যবহার পদ্ধতি উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। AI‑সৃষ্ট ভুয়া কন্টেন্টের প্রবেশের ফলে ব্যবহারকারীরা তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা পূর্বের তুলনায় বেশি সতর্কতা ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি দাবি করে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, যদি AI‑স্লপের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে না আনা হয়, তবে তা জনমত গঠন, নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং সামাজিক সংহতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। থেওডোরের উদ্যোগের মতো স্বেচ্ছাসেবী প্রচেষ্টা এবং প্রযুক্তি কোম্পানির নীতি পরিবর্তন একসাথে কাজ করলে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।
সামাজিক মিডিয়ায় AI‑সৃষ্ট ভুয়া কন্টেন্টের দ্রুত বিস্তার এবং তার ফলে সৃষ্ট জনসচেতনতা, ভবিষ্যতে তথ্য পরিবেশকে কীভাবে গঠন করবে, তা এখনো অনিশ্চিত, তবে বর্তমান প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখায় যে ব্যবহারকারীর সতর্কতা এবং প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণ দুটোই অপরিহার্য।



