মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সোমবার একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের রিকারসুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার (RAS) পদ্ধতিতে কোনো অনুমোদন ছাড়া চাষের অনুমতি না থাকার কথা জানায়। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, সরকার এই ধরনের ইনডোর, নিয়ন্ত্রিত চাষের জন্য কোনো নীতি বা অনুমোদন প্রকাশ করেনি এবং কোনো প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি প্রদান করা হয়নি।
প্রাণ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হবিগঞ্জ অ্যাগ্রো লিমিটেড সম্প্রতি ডেনমার্কের এ্যাসেনটপ্ট অ্যাকুয়ার সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে RAS প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইলিশ, এশিয়ান সিবাস ও গ্রুপার চাষের পরিকল্পনা প্রকাশ করে। দুই কোম্পানি এই প্রকল্পে দুই বছরের মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ইউরো (প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা) বিনিয়োগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।
মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার রাবিবার মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত একটি সভায় এই উদ্যোগের ওপর আলোচনা করেন। সভায় ইলিশের জাতীয় অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব তুলে ধরা হয় এবং বলা হয় যে, ইলিশের উৎপাদন মূলত প্রাকৃতিক প্রজনন চক্র ও নদীনির্ভর পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। তাই কোনো নতুন চাষ পদ্ধতি নীতি ও আইনগত দিক থেকে সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইলিশ সংক্রান্ত যে কোনো গবেষণা, পরীক্ষামূলক কাজ বা প্রযুক্তিগত উদ্যোগকে বিদ্যমান আইন, নীতি ও জাতীয় স্বার্থের আলোকে এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি অনুমোদন সাপেক্ষে পরিচালনা করতে হবে। অনুমোদনবিহীন কোনো কার্যক্রমকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে।
প্রাণ গ্রুপের এই উদ্যোগের ফলে দেশের সামুদ্রিক মাছের বাজারে নতুন সরবরাহের সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে, তবে অনুমোদন প্রক্রিয়া না পেলে প্রকল্পের বাস্তবায়ন ঝুঁকির মুখে পড়বে। রিকারসুলেটিং সিস্টেমের মাধ্যমে ইলিশ চাষের পরিকল্পনা যদি অনুমোদিত হয়, তবে তা ইলিশের মৌসুমী ঘাটতি পূরণে সহায়তা করতে পারে এবং রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে, মন্ত্রণালয়ের সতর্কতা ইঙ্গিত করে যে, সরকার এখনও রিকারসুলেটিং অ্যাকুয়াকালচারকে মূলধারার নীতি হিসেবে গ্রহণ করেনি। এই অবস্থায় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য অতিরিক্ত নথিপত্র ও সমন্বয় কাজ করতে হতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে, ইলিশের চাহিদা দেশের অভ্যন্তরে ও রপ্তানিতে উঁচু স্তরে রয়েছে। তবে ইলিশের উৎপাদন প্রাকৃতিক নদী ও হ্রদে সীমাবদ্ধ থাকায় সরবরাহের অস্থিরতা দেখা দেয়। RAS প্রযুক্তি যদি অনুমোদিত হয়, তবে তা সরবরাহের স্থিতিশীলতা বাড়িয়ে মূল্য স্থিতিশীল করতে পারে।
প্রাণ গ্রুপের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পটি হবিগঞ্জের একটি নির্দিষ্ট জমিতে গৃহস্থালি পরিবেশে পরিচালিত হবে, যেখানে জল পুনঃচক্রায়ন ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মাছের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা হবে। এই পদ্ধতি প্রচলিত মুক্ত জলে চাষের তুলনায় উচ্চ উৎপাদন দক্ষতা ও কম রোগের ঝুঁকি প্রদান করতে পারে।
তবে, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসারে, কোনো নতুন প্রযুক্তি বা পদ্ধতি চালু করার আগে পরিবেশগত প্রভাব, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্থানীয় মৎস্যজীবীদের অধিকার বিবেচনা করা আবশ্যক। এই দিক থেকে অনুমোদন প্রক্রিয়ায় পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থা ও স্থানীয় মৎস্য সমিতির মতামতও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
বিনিয়োগের দিক থেকে, ৩ কোটি ইউরোর বড় পরিমাণের তহবিল দুই বছরের মধ্যে প্রয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এই তহবিল মূলত প্রযুক্তি সরঞ্জাম, গৃহস্থালি ট্যাঙ্ক, জল শোধন ব্যবস্থা এবং কর্মশক্তি প্রশিক্ষণে ব্যয় হবে বলে জানা যায়।
মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে, ইলিশের চাষে কোনো অননুমোদিত উদ্যোগের ফলে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ, মূল্য হ্রাস এবং স্থানীয় মৎস্যজীবীদের আয়ের ক্ষতি হতে পারে। তাই, সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষকে আইনগত কাঠামোর মধ্যে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংক্ষেপে, সরকার রিকারসুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার পদ্ধতিতে ইলিশ চাষের জন্য স্পষ্ট নীতি ও অনুমোদন না থাকা পর্যন্ত কোনো উদ্যোগকে স্বীকৃতি দেবে না। বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুমোদন প্রাপ্তির জন্য প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত করতে হবে এবং পরিবেশ, জাতীয় স্বার্থ ও স্থানীয় মৎস্যজীবীদের স্বার্থ বিবেচনা করে পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। ভবিষ্যতে যদি অনুমোদন প্রাপ্ত হয়, তবে ইলিশের সরবরাহ স্থিতিশীলতা, রপ্তানি সম্ভাবনা এবং বাজারের মূল্য কাঠামোতে ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করা যায়।



