ড. আলী রিয়াজ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক, রোববার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় জানিয়েছেন, দেশের বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, ফ্যাসিবাদী কাঠামো বিলুপ্তি এবং ভবিষ্যতে নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন নিশ্চিত করতে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিকল্প নেই। তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই সনদ শুধুমাত্র সংবিধান নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার রূপরেখা হিসেবে কাজ করবে, যার মাধ্যমে জবাবদিহিমূলক বিচার ব্যবস্থা এবং সমান নির্বাচনী পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সভাটি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ আয়োজনের অংশ হিসেবে দুপুর ১১টায় অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থিত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিশ্লেষকরা রিয়াজের বক্তব্য শোনার পর প্রশ্নোত্তর সেশনে অংশ নেন।
ড. রিয়াজ উল্লেখ করেন, গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে জনগণ ভোটের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং এর জন্য তিনি সরাসরি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, নির্বাচন প্রক্রিয়াকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক নীতির সরাসরি লঙ্ঘন।
২০১৪ সালের নির্বাচনের পূর্বে, রিয়াজের মতে, নির্বাচন কমিশন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েও শেখ হাসিনা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ঐ সময়ে কমিশনকে বলা হয়েছিল, “দেশের মানুষ কেন ভোট দেবে, আমি যা বলব তাই করো” – এই ধরনের নির্দেশনা গণতন্ত্রকে ক্ষুণ্ন করেছে।
রিয়াজ আরও অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশনের মতো সংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আওয়ামী লীগ দলের কর্মীদের মাধ্যমে গঠন করা হয়েছিল। একইভাবে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)ও দলীয় প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল না। তিনি বলেন, ছাত্রলীগের কর্মীদেরকে চাকরির ব্যবস্থা করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা হিসেবে বিবেচিত।
এইসব অভিযোগের ভিত্তিতে রিয়াজের মতে, দেশের সাধারণ মানুষ সব ক্ষেত্রে বঞ্চিত ও প্রতারিত হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এখন পুরোনো ফ্যাসিবাদী কাঠামো ভাঙার সময় এসেছে এবং জুলাই সনদ এই পরিবর্তনের জন্য ঐতিহাসিক সুযোগ প্রদান করে।
ড. রিয়াজের বক্তব্যে তিনি বিশেষভাবে তরুণ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, যদিও সবাই এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানেন না, তবুও তারা বুঝতে পারবে যে এই পরিবর্তনগুলো দেশের মৌলিক নীতি ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সভায় উপস্থিত এক বিশ্লেষক রিয়াজের মন্তব্যকে “গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যাল” হিসেবে মূল্যায়ন করেন, যদিও তিনি উল্লেখ করেন, ভোটারদের মতামত গঠন করার আগে সকল পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনা করা দরকার।
ড. রিয়াজের বক্তব্যের পর, কিছু উপস্থিত শিক্ষার্থী প্রশ্ন তুলেন যে, যদি নির্বাচন কমিশনের স্বতন্ত্রতা নিশ্চিত না হয়, তবে কীভাবে নতুন সংবিধানিক কাঠামো তা পরিবর্তন করবে। রিয়াজ উত্তর দেন, নতুন সংবিধানিক বিধানগুলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য নকশা করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে স্বতন্ত্র সংস্থার কার্যকারিতা রক্ষা করবে।
সেশন শেষে, রিয়াজ পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী কাঠামো বিলুপ্ত করা এবং স্বচ্ছ বিচার ব্যবস্থা গঠন করা সম্ভব হবে। তিনি সকল নাগরিককে এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
এই মতবিনিময় সভা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে সংবিধান সংস্কার, নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বিষয়ক প্রশ্নগুলো কেন্দ্রীয় আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে।
গণভোটের ফলাফল ও তার পরবর্তী রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর নজর রাখার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো প্রস্তুতি নিচ্ছে, যাতে দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হয়।



