অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ সোমবার আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি, বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) সোনালী ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে উল্লেখ করেন, পরের সরকারকে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে মোটামুটি স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করেছে এবং বেশ কিছু কঠিন সমস্যার সমাধান করেছে, তবে সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো আরও বৃহত্তর হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রচেষ্টা সম্পর্কে তিনি উল্লেখ করেন, যদিও সংস্কারমূলক পদক্ষেপগুলো এখনো সরাসরি লাভজনক ফলাফল দেয়নি, তবু সেগুলো ভবিষ্যৎ সরকারকে সহায়তা করবে বলে তিনি আশাবাদী। এই সংস্কারগুলোকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হলে নতুন সরকারের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং ট্যাকটিক্যাল পরিচালনা প্রয়োজন হবে।
সামনের বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে অন্যতম হল রাজনৈতিক সরকারের অধীনে আর্থিক নীতি ও ব্যাংকিং নিয়মাবলীর সুষ্ঠু প্রয়োগ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে এবং রাজনৈতিক চাপের মুখেও স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হতে হবে। সরাসরি ‘না’ বলার বদলে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা করে নীতি ব্যাখ্যা করা এবং ব্যাংকিং আইন, অডিট মানদণ্ডের অনুসরণ নিশ্চিত করা জরুরি।
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ ও গণভোটের ফলাফল দেশের শাসনভার নতুন নির্বাচিত সরকারের হাতে পৌঁছাবে। এই পরিবর্তনের সময়ে আর্থিক নীতি ও ঋণ বিতরণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন হবে, যা তিনি সম্মেলনে তুলে ধরেন। বিশেষ করে ঋণ নীতি নির্ধারণে রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে সমন্বয় ও সমঝোতার মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দেন।
ঋণ বিতরণে তিনি বড় ব্যবসায়িক সংস্থার তুলনায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান। কারণ এই প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরাসরি ভূমিকা রাখে এবং দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সক্ষম। তাই, তাদের জন্য ঋণ সহজলভ্য করা এবং ক্রেডিট শর্তগুলোকে অনুকূল করা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হবে।
সালেহউদ্দিন আহমেদ উল্লেখ করেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ সহজলভ্য করা শুধু আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াবে না, বরং বেকারত্বের হার কমাতে সহায়তা করবে। তিনি বলেন, এই সেক্টরে বিনিয়োগ বাড়লে স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং রপ্তানি সক্ষমতা উন্নত হবে, যা সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য। তিনি ব্যাংককে অডিট মানদণ্ডের কঠোর অনুসরণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি শক্তিশালী করার পরামর্শ দেন, যাতে ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক অবস্থা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা যায়। এই ধরনের কাঠামোগত সংস্কার ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়ক হবে।
রাজনৈতিক সরকারের অধীনে আর্থিক নীতি প্রয়োগে সম্ভাব্য চাপের মোকাবিলায় তিনি ব্যাংক কর্মকর্তাদের আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে উৎসাহিত করেন। সরাসরি ‘না’ বলার পরিবর্তে নীতি ব্যাখ্যা, সমঝোতা এবং ন্যায্য শর্তে ঋণ প্রদানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যাতে অর্থনীতির সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি না হয়।
সামগ্রিকভাবে, পরের সরকারকে অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে কাজ করতে হবে এবং ব্যাংকিং খাতের পেশাদারিত্বকে শক্তিশালী করতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সঠিক সংস্কার, স্বচ্ছ ঋণ নীতি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের সমর্থনই দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মূল চাবিকাঠি হবে।
অবশেষে, তিনি উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ে আর্থিক নীতি ও ঋণ বিতরণে সমন্বিত ও সমঝোতাপূর্ণ পদ্ধতি গ্রহণ করলে অর্থনৈতিক অস্থিরতা কমে যাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন সরকারকে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে এবং সকল আর্থিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখতে হবে।



