মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের মৃত্যুর পর, তার নিকটস্থ সহযোগীর দ্বারা লিবিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি করার একটি বিশদ পরিকল্পনা প্রকাশিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগে প্রকাশিত সাম্প্রতিক নথি অনুসারে, এপস্টেইনের সহকর্মী ২০১১ সালের জুলাই মাসে একটি ই‑মেইল মাধ্যমে লিবিয়ার আটকে থাকা বিশাল আর্থিক সম্পদের ওপর হাত রাখতে চেয়েছিলেন। এই পরিকল্পনা লিবিয়ার গাদ্দাফি বিরোধী গণঅভ্যুত্থানের চরম পর্যায়ে গৃহীত হয়েছিল, যখন দেশটি রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে ছিল।
নথিতে উল্লেখ আছে যে, লিবিয়ার প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক বাজারে অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ৩২.৪ বিলিয়ন ডলার জমা রয়েছে। এপস্টেইনের সহযোগী দাবি করেন, প্রকৃত পরিমাণের তিন থেকে চার গুণ বেশি সম্পদ থাকতে পারে, যা আরও বিশাল আর্থিক সুযোগের ইঙ্গিত দেয়। তিনি প্রস্তাব করেন, যদি এই সম্পদের ৫ থেকে ১০ শতাংশ উদ্ধার করা যায়, তবে তার বিনিময়ে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ কমিশন প্রদান করা হবে, ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিলিয়ন ডলারের মালিক হতে পারবে।
ই-মেইলে উল্লেখ করা হয়েছে, এই চুরির পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৬ এবং ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রাক্তন কর্মকর্তাদের সহায়তা নেওয়ার কথা ছিল। প্রেরক দাবি করেন, উভয় সংস্থার একাধিক সাবেক কর্মকর্তা এই অবরুদ্ধ সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধার করতে আগ্রহী ছিলেন। যদিও কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি, তবু প্রস্তাবিত সহযোগিতা গোপন চ্যানেলের মাধ্যমে পরিচালিত হতে চেয়েছিল।
লিবিয়ার গাদ্দাফি পতনের পর দেশ পুনর্গঠনের জন্য একশ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার পরিকল্পনা ছিল, যা এপস্টেইনের সহযোগীও তার প্রভাব বিস্তারের সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন। নথিতে উল্লেখ আছে, এই অর্থের কিছু অংশকে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক আইন সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে আইনি ও আর্থিক সুবিধা অর্জনের পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিল। এভাবে লিবিয়ার বিশাল জ্বালানি সম্পদ এবং উচ্চশিক্ষিত কর্মশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক লুণ্ঠনের ছক গড়ে তোলার ইচ্ছা প্রকাশ পেয়েছে।
মার্কিন ফেডারেল তদন্তকারী সংস্থা বর্তমানে এই নথির সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করার জন্য একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করেছে। এপস্টেইনের সহযোগীকে আর্থিক অপরাধ, আন্তর্জাতিক সম্পদ চুরি এবং গোপন তথ্যের অপব্যবহারের অভিযোগে ফৌজদারি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার প্রাক্তন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আইনগত পদক্ষেপের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে।
লিবিয়ার সরকারও এই প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে অবরুদ্ধ সম্পদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে। লিবিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় একত্রে কাজ করে অবরুদ্ধ তহবিলের প্রকৃত পরিমাণ ও অবস্থান নির্ণয় করতে চায়, যাতে কোনো অবৈধ লেনদেনের সুযোগ না থাকে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়ে থাকে, তবে এটি আন্তর্জাতিক আর্থিক সিস্টেমের দুর্বলতা ও গোপন চুক্তির ঝুঁকি উন্মোচন করবে। একই সঙ্গে, গাদ্দাফি পতনের পর লিবিয়ার অর্থনৈতিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব পড়তে পারে, কারণ অবরুদ্ধ সম্পদের পুনরুদ্ধার বা চুরি উভয়ই দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
অধিক তদন্তের ফলাফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এবং আন্তর্জাতিক আইন সংস্থাগুলো এই মামলায় সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছে। এপস্টেইনের নেটওয়ার্কের আর্থিক লেনদেনের উপর নজরদারি বাড়বে, এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ গোপন পরিকল্পনা রোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা শক্তিশালী করা হবে।
এই ঘটনার পর, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় লিবিয়ার সম্পদ সুরক্ষার জন্য একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এবং গোপন আর্থিক চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে আদালতে এই মামলার ফলাফল লিবিয়ার আর্থিক স্বায়ত্তশাসন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ন্যায়বিচারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে থাকবে।



