কিউবার রাজধানী হাভানার বাইরের একটি এলাকায় রোববার স্থানীয় বাসিন্দা ও গির্জা প্রতিনিধিরা শীর্ষ মার্কিন কূটনীতিকের উপস্থিতিতে তাকে “খুনি” ও “সাম্রাজ্যবাদী” বলে চিৎকার করে প্রতিবাদ জানায়। এই প্রতিবাদের সময় কূটনীতিকের নিরাপত্তা দলকে ঘিরে তীব্র উত্তেজনা দেখা যায়। ঘটনাস্থলে উপস্থিতদের মতে, কূটনীতিকের কাজ কিউবায় অশান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিউবার সরকারের অভিযোগকে “ভয় দেখানোর ব্যর্থ কৌশল” হিসেবে খণ্ডন করে। মন্ত্রণালয় উল্লেখ করে, মার্কিন সরকার কিউবায় কোনো হস্তক্ষেপমূলক পদক্ষেপ নিতে চায় না এবং কূটনৈতিক কাজের স্বাভাবিক সীমার মধ্যে কাজ করছে।
মার্কিন শার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মাইক হ্যামার, যিনি ২০২৪ সালের শেষ দিকে কিউবায় দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন,কে কিউবার কিছু গোষ্ঠী “হস্তক্ষেপকারী” বলে অভিযুক্ত করেছে। হ্যামার পূর্বে দ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্যাথলিক চার্চের প্রতিনিধিসহ রাজনৈতিক পার্থক্যপূর্ণ গোষ্ঠীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। কিউবার সরকার তার এই সফরকে অস্থিরতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছে।
গত বছর কিউবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হ্যামারের কাজকে “হস্তক্ষেপমূলক” বলে চিহ্নিত করে, তাকে কিউবানদের সরকারের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়ার অভিযোগ জানায়। মার্কিন দূতাবাস এই অভিযোগ অস্বীকার করে, হ্যামার কেবল তার দায়িত্ব পালন করছেন বলে ব্যাখ্যা দেয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের সময় কিউবাকে “পতনের পথে থাকা রাষ্ট্র” বলে বর্ণনা করা হলেও, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিতও দেয়া হয়। ট্রাম্পের এই মন্তব্য কিউবায় অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়।
কিউবায় ১৯৫৯ সালের ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লবের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দা ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা কিউবার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে, ফলে কূটনৈতিক সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ছে।
মার্কিন সরকার রোববারের বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলেছে, কিউবায় কোনো কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য নেই এবং কূটনীতিকদের নিরাপদে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশনকে বাধা দেওয়ার দাবি কিউবার সরকারকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে।
কিউবার প্রতিবাদকারীরা হাভানার বাইরে কূটনীতিকের গাড়ি থামিয়ে তাকে শারীরিকভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেনি, তবে তাদের চিৎকার ও শারীরিক উপস্থিতি নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য অতিরিক্ত সতর্কতা তৈরি করেছে। নিরাপত্তা দল দ্রুত কূটনীতিককে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়।
কিউবার সরকার হ্যামারের সফরকে “অবৈধ হস্তক্ষেপ” হিসেবে গণ্য করে, এবং ভবিষ্যতে এমন কোনো কূটনৈতিক সফর অনুমোদন না করার সতর্কতা জানায়। একই সঙ্গে, কিউবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পুনরায় শুরু না করা পর্যন্ত কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি সম্ভব না বলে উল্লেখ করে।
মার্কিন সরকার কিউবায় কূটনৈতিক মিশন চালিয়ে যাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামো অনুসরণ করবে বলে নিশ্চিত করেছে। তবে, কিউবার সরকার যদি কূটনৈতিক কর্মীদের প্রবেশে বাধা দেয়, তবে তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, কিউবায় অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতা যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক কৌশলকে কঠিন করে তুলেছে। হ্যামারের সফর যদি সফল হয়, তবে তা কিউবার অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীর সঙ্গে সংলাপের নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে। অন্যদিকে, কিউবার সরকার যদি কূটনৈতিক বাধা আরোপ করে, তবে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা আরও তীব্র হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উভয় পক্ষের কাছ থেকে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। কিউবার অর্থনৈতিক সংকটের সমাধান ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার জন্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনার প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলা হয়েছে।
মার্কিন সরকার এবং কিউবার সরকার উভয়ই ভবিষ্যতে কূটনৈতিক সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা স্বীকার করেছে। তবে, বর্তমান সময়ে উভয় দেশের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাসের মাত্রা উচ্চ, যা কূটনৈতিক আলোচনার গতি ধীর করে তুলতে পারে।
কিউবায় এই প্রতিবাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া উভয়ই আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়েছে, এবং পরবর্তী সপ্তাহে দু’দেশের কূটনৈতিক নীতি কীভাবে পরিবর্তিত হবে তা নজরে থাকবে।



