প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের ছাগল পালন মোট প্রায় ২ কোটি ৭৩ লাখে পৌঁছেছে। এই বৃদ্ধির পেছনে গ্রামীণ পরিবারের স্বল্প পুঁজি, সীমিত জমি ও সহজ পালনের সুবিধা কাজ করছে। বিশেষ করে খুলনা ও রাজশাহী দুই বিভাগে শীর্ষ দশ জেলার অধিকাংশ গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে, যা স্থানীয় বাজারে মাংস, দুধ ও চামড়ার চাহিদা বাড়াচ্ছে।
যশোর জেলা, যা পদ্মা ও হুগলি নদীর মাঝের বদ্বীপের অংশ, ২০২৪-২৫ সালে প্রায় ১০ লাখ ২৪ হাজার ছাগল পালন করেছে। পূর্ববর্তী অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৭১ হাজার, অর্থাৎ প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই উত্থান স্থানীয় মাংস বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে বিক্রয়মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করেছে।
পাবনা জেলার মোট এলাকা ২,৩৭২ বর্গকিলোমিটার, এবং পদ্মা-যমুনা মিলনস্থলে অবস্থিত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এখানে প্রায় ১০ লাখ ৬৪ হাজার ছাগল পালন করা হয়েছে, যা গত বছরের ১০ লাখ ২৪ হাজার থেকে ৪০ হাজারের সামান্য বৃদ্ধি। এই ধারাবাহিকতা স্থানীয় পশু চিকিৎসা ও ফিড সরবরাহকারী সংস্থার জন্য স্থিতিশীল আয় নিশ্চিত করছে।
মেহেরপুর, দেশের পশ্চিম সীমান্তের একটি জেলা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬ লাখ ৭২ হাজার ছাগল পালন করেছিল। পরের বছর এই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১১ লাখ ৩ হাজারে পৌঁছেছে, যা ৬ লাখের বেশি বৃদ্ধি নির্দেশ করে। এই তীব্র বৃদ্ধির ফলে মেহেরপুরের ছাগল মাংস ও দুধের বাজারে নতুন সরবরাহ চেইন গড়ে উঠেছে, যা স্থানীয় কৃষি ব্যাবসায়ীদের জন্য লাভজনক সুযোগ তৈরি করছে।
নাটোর জেলার মোট এলাকা ১,৮৯৬ বর্গকিলোমিটার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এখানে প্রায় ১১ লাখ ৫২ হাজার ছাগল পালন করা হয়েছে, যেখানে পূর্ববর্তী বছরে সংখ্যা ছিল ৯ লাখ ৪১ হাজার। এই ২০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি স্থানীয় ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চাহিদা বাড়িয়েছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করেছে।
ঝিনাইদহ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ১১ লাখ ৬৪ হাজার ছাগল পালন করেছে। তবে ২০২৩-২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১১ লাখ ৭৯ হাজার, যা সামান্য হ্রাস নির্দেশ করে। এই হ্রাসের পেছনে সম্ভবত রোগ সংক্রমণ বা বাজারের মূল্য পরিবর্তন ভূমিকা রাখে, যা কৃষকদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলার মোট এলাকা ১,১৭১ বর্গকিলোমিটার। প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য অনুসারে এখানে ছাগল পালন সংখ্যা প্রায় ১২ লাখের কাছাকাছি, তবে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা অনুপস্থিত। এই অনিশ্চয়তা বাজার বিশ্লেষণে কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি করে, তবে জেলা-ভিত্তিক উৎপাদন বৃদ্ধির প্রবণতা স্পষ্ট।
ছাগল পালন বৃদ্ধি দেশের মাংস ও দুধের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গৃহস্থালী প্রোটিনের সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিড, ভ্যাকসিন ও পশু চিকিৎসা সেবার চাহিদা তীব্রভাবে বাড়ছে। ফলে সংশ্লিষ্ট শিল্পে বিনিয়োগের আকর্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আকারের ফিড মিল ও ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ছাগল পালনের দ্রুত বৃদ্ধি কৃষি ঋণ ও ক্রেডিট সেবার চাহিদা বাড়াবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ঋণ পণ্য তৈরি করছে, যা পালনের জন্য আধুনিক ফিড, হ্যাচারি ও রোগনিরোধক সরঞ্জাম ক্রয়কে সহজ করবে। এই আর্থিক প্রবাহের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতির সামগ্রিক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তবে দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে রোগ সংক্রমণ, বিশেষ করে পেস্টিস ও ফ্লু রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। সরকার ও বেসরকারি সংস্থা গুলোকে রোগ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে, যাতে উৎপাদন হ্রাস ও আয় ক্ষতি রোধ করা যায়। একই সঙ্গে, বাজারে ছাগল মাংসের মূল্য ওঠানামা কৃষকদের আয়কে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে, যা মূল্য স্থিতিশীলতা নীতি প্রয়োজনীয় করে তুলছে।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, ছাগল পালন ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাবে যদি সরকারী সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও বাজার সংযোগের ব্যবস্থা উন্নত করা হয়। বিশেষ করে মাংস ও দুধের প্রক্রিয়াজাত পণ্য, যেমন চিজ ও সসেজ, উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়লে মূল্য সংযোজনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ ধরনের উদ্যোগ গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়িয়ে স্থানীয় আয় বৃদ্ধি করবে।
সংক্ষেপে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শীর্ষ দশ জেলায় ছাগল পালন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গ্রামীণ বাজারে সরবরাহ শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করেছে। তবে রোগ নিয়ন্ত্রণ, মূল্য স্থিতিশীলতা ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় এবং দেশের প্রাণিসম্পদ শিল্পে অবদান বাড়ে।



