কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান আল থানি রোববার ঘোষণা করেছেন যে, দেশটি উদ্যোক্তা ও উচ্চপদস্থ নির্বাহীদের জন্য দশ বছরের দীর্ঘমেয়াদী বসবাসের অনুমতি প্রদানকারী একটি নতুন প্রোগ্রাম চালু করতে যাচ্ছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দক্ষ কর্মশক্তি দেশীয় বাজারে স্থায়ী করা।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতোই কাতারও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষ পেশাজীবী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ভিসা স্কিম চালু করেছে। উভয় দেশই এই নীতির মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক কাঠামোকে তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী করতে চায়। কাতারের এই পদক্ষেপকে একই ধরনের আঞ্চলিক প্রবণতার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কাতার সরকার দীর্ঘদিন থেকে তার অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যপূর্ণ করার পরিকল্পনা চালিয়ে আসছে। ২০২২ সালে জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনা (নেক্সট ২০৩০) এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (FDI) বাড়িয়ে নতুন সেক্টরে প্রবেশ করা হবে। দশ বছরের রেসিডেন্সি প্রোগ্রামকে এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা বিদেশি পুঁজি ও প্রযুক্তি দেশে আনতে সহায়তা করবে।
প্রস্তাবিত স্কিমের মাধ্যমে কাতার উচ্চমূল্যের সেক্টরে, যেমন ফিনটেক, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং লজিস্টিক্সে কাজ করা উদ্যোক্তা ও নির্বাহীদের দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায়। এ ধরনের মানবসম্পদ দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে, স্থানীয় কোম্পানিগুলোর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এখনো রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের নির্দিষ্ট যোগ্যতা মানদণ্ড প্রকাশিত হয়নি, তবে সূত্র অনুযায়ী এটি প্রধানত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক, শীর্ষ ব্যবস্থাপনা এবং উচ্চ পর্যায়ের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের লক্ষ্য করবে। আবেদনকারীদের আর্থিক স্বচ্ছতা, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং কাতারের অর্থনৈতিক লক্ষ্যগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণতা প্রমাণ করতে হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
প্রোগ্রামটি কাতারের নাগরিকদের পাশাপাশি আবেদনকারীর পারিবারিক সদস্যদেরও দেশে নিয়ে আসার সুযোগ দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া, উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগকারী এবং বড় প্রকল্পের মালিকদের জন্য বিশেষ সুবিধা, যেমন দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ, কর ছাড় এবং সম্পত্তি অধিগ্রহণে অগ্রাধিকার, অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
স্থানীয় ব্যবসা সমিতি ও বাণিজ্যিক গোষ্ঠী এই উদ্যোগকে দেশের বাণিজ্যিক পরিবেশকে উন্নত করার একটি বড় সুযোগ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। তারা উল্লেখ করেছে যে, দীর্ঘমেয়াদী রেসিডেন্সি পাসধারীরা কাতারের বাজারে নতুন পণ্য ও সেবা নিয়ে আসতে পারে, যা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক চাপ বাড়াবে এবং একইসাথে সহযোগিতার নতুন পথ খুলে দেবে।
দীর্ঘমেয়াদী ভিসা স্কিমের ফলে রিয়েল এস্টেট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং ভোক্তা সেবার চাহিদা বাড়বে বলে বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিয়েছেন। উচ্চ আয়ের পেশাজীবী ও তাদের পরিবারদের জন্য গৃহ, আন্তর্জাতিক বিদ্যালয় এবং স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বৃদ্ধি পাবে, যা সংশ্লিষ্ট সেক্টরে বিনিয়োগের প্রবাহ ত্বরান্বিত করবে।
আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা বিবেচনা করলে, কাতারকে সৌদি আরব ও ইউএই’র তুলনায় নিজস্ব সুবিধা তুলে ধরতে হবে। উভয় দেশই ইতিমধ্যে দীর্ঘমেয়াদী রেসিডেন্সি স্কিম চালু করেছে, তবে কাতার তার স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, আধুনিক অবকাঠামো এবং তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে প্রমোট করতে পারে। এই পার্থক্যগুলো সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীর সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে, নতুন নীতির কার্যকরী দিকগুলোতে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। আবেদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ভিসা নবায়ন নীতি এবং কর সংক্রান্ত নিয়মাবলী স্পষ্ট না হলে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী অনিশ্চয়তায় পড়তে পারেন। সরকারকে দ্রুত বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রকাশ করে, প্রক্রিয়ার সময়সীমা ও শর্তাবলী নির্ধারিত করে, এই ঝুঁকি কমাতে হবে।
প্রোগ্রামের আনুষ্ঠানিক কার্যকর তারিখ এখনো জানানো হয়নি, তবে সূত্র অনুসারে শীঘ্রই বিস্তারিত নথি প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। একবার বাস্তবায়িত হলে, কাতার তার অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ কৌশলকে ত্বরান্বিত করতে পারবে এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসা সম্প্রদায়ের মধ্যে তার আকর্ষণ বাড়াবে।
সংক্ষেপে, দশ বছরের রেসিডেন্সি স্কিম কাতারের জন্য উচ্চমূল্যের মানবসম্পদ ও পুঁজি আকর্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে। সফল বাস্তবায়ন হলে রিয়েল এস্টেট, সেবা এবং প্রযুক্তি সেক্টরে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি প্রত্যাশিত, তবে নীতির স্পষ্টতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করা হবে কিনা, তা ভবিষ্যৎ সফলতার মূল চাবিকাঠি হবে।



