জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে, বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন শুল্ক চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। চুক্তি স্বাক্ষরের তারিখ ৯ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত, এবং অনুষ্ঠানটি মার্কিন রাজধানী ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হবে। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এই প্রতিনিধিদলের প্রধান হিসেবে অংশ নেবেন।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে রওনা হয়ে প্রথমে টোকিওতে পৌঁছাবেন। টোকিওতে ৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ‑জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (বিজেইপিএ) স্বাক্ষর করার পরিকল্পনা রয়েছে। জাপান চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর, দুজনই সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।
মাহবুবুর রহমান রোববারের একটি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য ৯ ফেব্রুয়ারির তারিখ ইতিমধ্যে মার্কিন সরকার থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। চুক্তির খসড়া ও অনুমোদন সংক্রান্ত নথি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং স্বাক্ষরের জন্য প্রস্তুতি চলছে।
শুল্কের হার সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে, বর্তমান সময়ে বেশিরভাগ পণ্যের উপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপিত। কিছু দেশের ক্ষেত্রে এই হার একই রকম, আবার কিছু ক্ষেত্রে বেশি। সরকার আশা করছে যে নতুন চুক্তির মাধ্যমে হার কিছুটা কমবে, তবে চূড়ান্ত সংখ্যা ৯ ফেব্রুয়ারির আগে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
জাপানের সঙ্গে বিজেইপিএ চুক্তি স্বাক্ষরের পর, প্রথম দিন থেকেই ৭,৩৭৯টি বাংলাদেশি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। একই সঙ্গে, জাপানের ১,০৩৯টি পণ্য বাংলাদেশে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এই ব্যবস্থা উভয় দেশের বাণিজ্যিক প্রবাহকে ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ভারতের সাম্প্রতিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, সরকার কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করেনি। তৈরি পোশাক খাতে অর্জিত সক্ষমতার ফলে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। অন্যদিকে, ভারত বস্ত্র শিল্পে শক্ত অবস্থান বজায় রেখেছে এবং বৈশ্বিক বাজারে তার উপস্থিতি দৃঢ়।
বাংলাদেশ সরকার ভারতের থেকে কাঁচামালও ব্যাপকভাবে আমদানি করে, যা দেশের উৎপাদন শৃঙ্খলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ কারণে এফটিএ নিয়ে কোনো নীতি পরিবর্তনের দরকার নেই এবং উভয় দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকবে বলে সরকার আশ্বাস দিয়েছে।
শুল্ক চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে মার্কিন বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষত কৃষি পণ্য, হস্তশিল্প এবং প্রযুক্তি-নির্ভর সেবা ক্ষেত্রে শুল্ক হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে, যা রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে, আমদানি করা কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির উপর শুল্ক কমে উৎপাদন খরচ হ্রাস পেতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের এই পদক্ষেপটি নির্বাচনের পূর্বে অর্থনৈতিক নীতি স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে। শুল্ক হারের সমন্বয় এবং নতুন বাজার উন্মোচন দেশের বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তি বাংলাদেশকে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে আরও অন্তর্ভুক্ত করবে এবং রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াবে। তবে চুক্তির নির্দিষ্ট শর্তাবলি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বাজারে সুনির্দিষ্ট প্রভাব অনুমান করা কঠিন।
সারসংক্ষেপে, ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত শুল্ক চুক্তি বাংলাদেশের বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে। চুক্তির বাস্তবায়ন ও শুল্ক হারের সমন্বয় দেশের রপ্তানি-আমদানি কাঠামোতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।



