ঢাকা‑ব্রহ্মপুত্রের বিভিন্ন শহরে সক্রিয় নারীবাদী গোষ্ঠীকে সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিকভাবে ‘পশ্চিমা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। রক্ষণশীল ডানপন্থী সংগঠনগুলো নারীর অধিকার সংক্রান্ত প্রতিবাদ ও ক্যাম্পেইনকে বিদেশি হস্তক্ষেপের রূপে দেখিয়ে সম্পূর্ণ বয়কটের দাবি জানাচ্ছে। এই অভিযোগগুলো বিশেষ করে ২০২২‑২০২৩ সালের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পর তীব্রতা পেয়েছে, যখন নারীবাদী সক্রিয়তা জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
পশ্চিমা ধারণা আনা হচ্ছে এমন অভিযোগ বহু পোস্ট‑কলোনিয়াল দেশে সাধারণ। স্থানীয় সংস্কৃতির মধ্যে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমালোচনা করা বা সামাজিক পরিবর্তনের দাবি তোলার সময় নারীবাদী গোষ্ঠীকে প্রায়ই বিদেশি আদর্শের বাহক বলে অভিযুক্ত করা হয়। এই রূপে রক্ষণশীল গোষ্ঠী নারীবাদী হস্তক্ষেপকে ‘পশ্চিমা‑প্রভাবিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করে, ফলে তাদের কার্যক্রমকে অবৈধ ও অপ্রয়োজনীয় বলে চিহ্নিত করে।
এই রকম রেটোরিকের পেছনে একটি কঠোর ‘আমাদের সংস্কৃতি বনাম তাদের সংস্কৃতি’ দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে। স্বদেশীয় সংস্কৃতিকে বিশুদ্ধ, প্রামাণিক এবং হুমকির মুখে থাকা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, আর পশ্চিমা সংস্কৃতিকে আক্রমণাত্মক শক্তি হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়। এমন দ্বৈততা নারীবাদী আন্দোলনকে দেশের অভ্যন্তরে দমনমূলক প্রথা চ্যালেঞ্জ করার স্থান সীমিত করে, কারণ কোনো পরিবর্তনের প্রচেষ্টা স্বয়ংই ‘বিদেশি’ লেবেল পেতে পারে।
বাংলাদেশে এই ধরনের অভিযোগের ইতিহাস দীর্ঘ। বিশেষ করে সাম্প্রতিক উত্থান‑পতনের পর রক্ষণশীল ডানপন্থী গোষ্ঠী নারীবাদকে ‘পশ্চিমা কাজ’ বলে সমালোচনা করে এবং তার সম্পূর্ণ বয়কটের দাবি তোলার জন্য প্রতিবাদসূচি চালু করেছে। তারা দাবি করে যে, নারীর অধিকার সংক্রান্ত দাবিগুলো দেশের ঐতিহ্য ও ধর্মীয় মূল্যবোধের বিরোধী, ফলে জাতীয় পরিচয়কে ক্ষুণ্ণ করে।
অধিকাংশ রক্ষণশীল গোষ্ঠীর বক্তব্যে ‘সংস্কৃতি রক্ষা’ ও ‘পশ্চিমা হস্তক্ষেপের বিরোধিতা’ প্রধান যুক্তি হিসেবে উঠে আসে। তারা যুক্তি দেয় যে, বিদেশি আদর্শের প্রবেশে দেশের সামাজিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এই রেটোরিকের মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে জাতীয় সংস্কৃতির রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করে, যদিও একই সময়ে তারা নারীবাদী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য—লিঙ্গ সমতা ও নারীর সুরক্ষা—কে অবমূল্যায়ন করে।
ঐতিহাসিক গবেষণা দেখায় যে, ‘স্থানীয় বনাম পশ্চিমা’ দ্বৈততা নিজেই ঔপনিবেশিক চিন্তার একটি অবশিষ্ট। এই দৃষ্টিভঙ্গি ঔপনিবেশিক শাসনের সময় গঠিত হয়, যখন জাতীয়তাবাদীরা নিজেদের পরিচয় গড়তে পশ্চিমা শাসনের বিপরীতে ‘অক্ষত’ স্থানীয় সংস্কৃতিকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরেছিল। ফলে, কোনো সংস্কৃতিক পরিবর্তনকে ঔপনিবেশিক হস্তক্ষেপের সমান করে দেখা শুরু হয়।
ফেমিনিস্ট স্কলার উমা নারায়ণ (১৯৯৭) এই বিভাজনের মূলকে অ্যান্টি‑কলোনিয়াল জাতীয়তাবাদে খুঁজে পেয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ঔপনিবেশিক শাসনকালে দেশীয় আন্দোলনগুলো পশ্চিমা মূল্যবোধের প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। এই প্রক্রিয়ায় ‘অশুদ্ধ’, ‘প্রামাণিক’ সংস্কৃতির ধারণা গড়ে ওঠে, যা আজকের রক্ষণশীল গোষ্ঠীর রেটোরিকের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ঐতিহাসিক পটভূমি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে নারীবাদী দাবি—যেমন লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, কর্মক্ষেত্রের বৈষম্য, এবং শিক্ষার সমান সুযোগ—কে স্বয়ংই ঔপনিবেশিক ধারণা হিসেবে খারিজ করা যায় না। বরং, এসব দাবি দেশের সামাজিক কাঠামোর উন্নয়ন ও মানবাধিকার রক্ষার অংশ। তবু রক্ষণশীল গোষ্ঠীর বয়কটের আহ্বান নারীবাদী সংগঠনগুলোর জনসমর্থন ও আর্থিক সহায়তায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বয়কটের দাবি রাজনৈতিক পরিণতি আনতে পারে। যদি সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এই রেটোরিককে সমর্থন করে, তবে নারীর অধিকার সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। অন্যদিকে, সিভিল সোসাইটি ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এই চাপের মোকাবিলায় আইনি পদক্ষেপ বা সমর্থনমূলক ক্যাম্পেইন চালু করতে পারে।
ভবিষ্যতে এই বিতর্কের গতি আরও তীব্র হতে পারে। রক্ষণশীল গোষ্ঠী নারীবাদকে ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’ হিসেবে চিহ্নিত করে রাজনৈতিক মঞ্চে ব্যবহার করতে পারে, আর নারীবাদী সংগঠনগুলো এই লেবেলকে প্রত্যাখ্যান করে তাদের দাবির বৈধতা তুলে ধরবে। উভয় দিকের মধ্যে আইনি লড়াই, মিডিয়া যুদ্ধ এবং জনমত গঠনের জন্য নতুন কৌশল দেখা যাবে।
সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশের নারীবাদকে ‘পশ্চিমা’ লেবেল দিয়ে সমালোচনা করা একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সংঘাতের অংশ। এটি কেবল লিঙ্গ সমতার প্রশ্ন নয়, বরং দেশের পরিচয়, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার এবং আধুনিকতার সাথে সমন্বয়ের প্রশ্ন। এই দ্বন্দ্বের সমাধান না হলে নারীর অধিকার সংক্রান্ত নীতি ও সামাজিক পরিবর্তনের পথ আরও জটিল হয়ে উঠবে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার, নাগরিক সমাজ এবং একাডেমিক ক্ষেত্রের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন, যাতে নারীবাদকে স্বতন্ত্র ও দেশীয় প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা যায়, এবং ‘পশ্চিমা’ লেবেলিংয়ের মাধ্যমে তা অবমাননা না করা হয়।



