আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল রটারড্যাম (IFFR) এ শারবনু সাদাত এবং মারিনা এর গর্বাচের শর্ট ফিল্মের বিশ্বপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। শারবনু সাদাত, যিনি ২০২১ সালে কাবুল থেকে জার্মানি পলায়ন করেন, তার ‘সুপার আফগান জিম’ শিরোনামের ১২ মিনিটের শর্ট ফিল্ম রটারড্যামের মূল প্রোগ্রামে বিশ্বপ্রদর্শনী পেয়েছে। একই সময়ে, ইউক্রেনের পরিচালক মারিনা এর গর্বাচ, যিনি ‘ক্লোনডাইকে’ ছবির জন্য পরিচিত, তার ‘রোটেশন’ শির্ট ফিল্ম উপস্থাপন করেন।
দুই চলচ্চিত্রই ‘ডিসপ্লেসমেন্ট ফিল্ম ফান্ড’ থেকে আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। এই তহবিলটি গত বছর ক্যাট ব্ল্যাঙ্কেট এবং IFFR-এর হুবার্ট বালস ফান্ডের যৌথ উদ্যোগে চালু হয়, যার লক্ষ্য শরণার্থী ও স্থানচ্যুত পরিচালককে €১০০,০০০ (প্রায় $১২০,০০০) অনুদান প্রদান করা। মোট পাঁচজন পরিচালককে এই তহবিল থেকে সহায়তা করা হয়েছে, যার মধ্যে ইরানীয় পরিচালক মোহাম্মদ রাসুলফ (‘দ্য সিড অফ দ্য স্যাক্রেড ফিগ’), সিরিয়ার হাসান কাট্টান (‘লাস্ট মেন ইন আলেপো’) এবং সোমালি-অস্ট্রিয়ান চলচ্চিত্র নির্মাতা মো হারাওয়ে (‘দ্য ভিলেজ নেক্সট টু প্যারাডাইস’) অন্তর্ভুক্ত।
শারবনু সাদাতের ‘সুপার আফগান জিম’ তার শরণার্থী জীবনের অভিজ্ঞতা ও আফগানিস্তানের সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। সাদাতের পরবর্তী বড় কাজ, ‘নো গুড মেন’, আগামী মাসে বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে প্রদর্শিত হবে, যা তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ধারাকে আরও দৃঢ় করবে।
‘রোটেশন’ ১২ মিনিটের একটি সংক্ষিপ্ত চলচ্চিত্র, যা রাশিয়ার আক্রমণের পর ইউক্রেনের নাগরিকদের সামরিক সেবায় রূপান্তরের মানসিক চ্যালেঞ্জকে তুলে ধরে। ছবিতে এক তরুণ ইউক্রেনীয় নারীকে দেখানো হয়েছে, যিনি সিভিল জীবনের থেকে সামরিক পরিবেশে প্রবেশের পর থেরাপিউটিক হিপনোসিস রীতির মাধ্যমে মানসিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি নতুন বাস্তবতার সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন খোঁজে।
মারিনা এর গর্বাচের মতে, ‘রোটেশন’ তৈরির পেছনে সৃজনশীল স্বাধীনতার সুযোগ ছিল প্রধান প্রেরণা। তহবিলের শর্তে কোনো প্রত্যাশা না থাকায় তিনি এবং তার দল সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিতভাবে কাজ করতে পেরেছেন, যা তাদেরকে গভীরভাবে অনুভূত বিষয়গুলোকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত করার সুযোগ দিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, displacement (স্থানচ্যুতি) সম্পর্কে তার ধারণা থেকে এই প্রকল্পের সূচনা হয়েছে, এবং তিনি সাধারণ নাগরিকদের সামরিক সেবায় রূপান্তরের সময় যে মানসিক অস্থিরতা ও নতুন স্বাভাবিকতার সন্ধান হয়, তা তুলে ধরতে চেয়েছেন।
গবেষণার অংশ হিসেবে গর্বাচ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ করেছেন, যার মাধ্যমে তিনি বাস্তবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তার মতে, শরণার্থী বা স্থানচ্যুত ব্যক্তিরা যখন নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করে, তখন মানসিক সহায়তা ও সঠিক থেরাপি তাদের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
‘ডিসপ্লেসমেন্ট ফিল্ম ফান্ড’ এর মাধ্যমে সমর্থিত এই দুই শর্ট ফিল্ম রটারড্যামের দর্শকদের কাছে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছে। শারবনু সাদাতের আফগানিস্তানের সামাজিক পরিবর্তন এবং মারিনা এর গর্বাচের ইউক্রেনীয় যুদ্ধের মানবিক দিক উভয়ই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র জগতের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। এই ফিল্মগুলো স্থানচ্যুতি, পরিচয় এবং মানসিক পুনর্গঠন বিষয়ক আলোচনাকে সমৃদ্ধ করেছে, যা ভবিষ্যতে আরও বেশি শরণার্থী শিল্পীকে সমর্থন ও স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
রটারড্যামের এই অনুষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র শিল্পে স্থানচ্যুত পরিচালকদের সৃজনশীল কাজকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তদুপরি, শারবনু সাদাতের ‘নো গুড মেন’ এর বার্লিন ফেস্টিভ্যালে উদ্বোধনী প্রদর্শনীও শীঘ্রই চলচ্চিত্রপ্রেমী ও সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, যা তার ক্যারিয়ারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
স্থানচ্যুতি ও মানবিক সংকটের পটভূমিতে গড়ে ওঠা এই চলচ্চিত্রগুলো, দর্শকদেরকে কেবল বিনোদন নয়, বরং গভীর সামাজিক ও মানসিক প্রশ্নের মুখোমুখি করে। রটারড্যামের এই দুই শর্ট ফিল্মের সফলতা, ভবিষ্যতে আরও বেশি শরণার্থী ও স্থানচ্যুত শিল্পীর জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।



