১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্দলীয় সরকারের কাঠামোর অধীনে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনটি দেশের স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম বৃহৎ গণভোট হিসেবে স্বীকৃত এবং একই সঙ্গে নির্দলীয় পদ্ধতির অধীনে অনুষ্ঠিত একমাত্র জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনের সময় প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে, যা রাজনৈতিক পরিবর্তনের মঞ্চ প্রস্তুত করে।
অস্থায়ী সরকারের নেতৃত্বে গৃহীত এই পদক্ষেপের পেছনে ১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে স্বৈরাচারী এরশাদ শাসনের বিরোধে গড়ে ওঠা গণতান্ত্রিক আন্দোলন ছিল মূল চালিকাশক্তি। এরশাদের শাসনামলে বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, প্রশাসন, ব্যাংক ও বাণিজ্যসহ দেশের সব সেক্টরে তার দলের হস্তক্ষেপ স্পষ্ট হয়ে দাঁড়ায়, এবং নির্বাচন প্রক্রিয়াও তার প্রভাবের শিকার হয়। ফলে, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য নির্দলীয় পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়।
অনেক বিশ্লেষক ও নাগরিকের মতে, ১৯৯১ সালের এই নির্বাচন দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত হয়। নির্বাচন কমিশন ও ভোটারদের মধ্যে উচ্চ মাত্রার বিশ্বাস গড়ে ওঠে, যা পূর্ববর্তী নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি করে। তবে কিছু সমালোচক উল্লেখ করেন যে, এরশাদের শাসনের আগে ও স্বাধীনতার পরের কিছু নির্বাচনেরও স্বচ্ছতার অভাব ছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ৭ মার্চ ১৯৭৩-এ প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংসদীয় ভোট হিসেবে চিহ্নিত। এরপর জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৭ সালে প্রথম গণভোট, ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই সময়কালে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন মতামত প্রকাশ পায়।
১৯৮১ সালের ৩০ মে, সেনাবাহিনীর কিছু বিচ্যুত সদস্যের হাতে জিয়াউর রহমানের মৃত্যু ঘটার পর, উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন। তার পরবর্তী পদস্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে আওয়ামী লীগের ড. কামাল হোসেন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অংশ নেন। এই নির্বাচনের ফলাফল ও প্রক্রিয়া নিয়েও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পায়, বিশেষ করে স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতার প্রশ্ন উত্থাপিত হয়।
বহু বিশ্লেষক দাবি করেন, ১৯৭৩, ১৯৭৭, ১৯৭৮, ১৯৭৯, ১৯৮১ সালের নির্বাচনের কোনোটি সম্পূর্ণভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না। এই ধারাবাহিকতা দেশের রাজনৈতিক সংস্কারের পথে বাধা সৃষ্টি করে এবং জনগণকে অসন্তোষের দিকে ধাবিত করে। ফলে, স্বৈরাচারী শাসনের সময়কালে নির্বাচনী ফলাফলকে বিকৃত করে প্রচার করার জন্য ‘মিডিয়া ক্যু’ নামক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ, জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন এবং স্বৈরাচারী শাসন পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেন। এরশাদের শাসনামলে নির্বাচনী প্রক্রিয়া আরও নিয়ন্ত্রণের মুখে আসে, এবং পূর্বের নির্বাচনের ত্রুটিগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই সময়ে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা গড়ে ওঠে।
সারসংক্ষেপে, নির্দলীয় সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও এই নির্বাচনকে সুষ্ঠু হিসেবে প্রশংসা করা হয়, তবে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে চলমান বিতর্ক দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উন্নয়নে চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য প্রতিষ্ঠানগত সংস্কার ও নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য হবে।



