বৃহস্পতিবার রাত থেকে রবিবার পর্যন্ত তিব্বতীয় নির্বাসিত সম্প্রদায় ২৭টি দেশে একসাথে ভোটদান শুরু করে, যা তাদের ঐতিহ্যবাহী ভূমি তিব্বতের জন্য একটি সরকার গঠন করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়। ভোটদান কোনো চীনা অঞ্চলে অনুষ্ঠিত হয়নি; তিব্বতীয় স্বশাসনের অভাবের পরেও এই প্রক্রিয়া তিব্বতীয় জনগণের রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের ইচ্ছা প্রকাশ করে।
এই নির্বাচনের অংশগ্রহণকারী গোষ্ঠীতে হিমালয়ের তুষারময় মঠের লাল পোশাক পরা বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, দক্ষিণ এশিয়ার বড় শহরে বসবাসকারী রাজনৈতিক নির্বাসিত এবং অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বসবাসকারী শরণার্থী অন্তর্ভুক্ত। মোট ৯১,০০০ নিবন্ধিত ভোটার এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়, যা তিব্বতীয় জনগণের বৈশ্বিক বিস্তৃতি ও ঐক্যের প্রতিফলন।
দার্মসালার হিলটাউন, যেখানে তিব্বতীয় সরকার-নিঃসরণ (সেন্ট্রাল তিব্বত অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) অবস্থিত, সেখানে ৩৩ বছর বয়সী গ্যাল্টসেন চোক্যে এই নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই ভোটদান তিব্বতীয় স্বাধীনতার সংগ্রামকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চালিয়ে যাওয়ার একটি স্পষ্ট চিহ্ন। তার মন্তব্য তিব্বতীয় জনগণের স্বপ্ন ও দৃঢ়সংকল্পকে জোরালোভাবে প্রকাশ করে।
এই নির্বাচন একটি অনন্য প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের সীমারেখা ছাড়াই একটি সংসদ গঠন করা হচ্ছে। তিব্বতীয় নির্বাসিতরা একটি পার্লামেন্টের জন্য ভোট দিচ্ছেন, যদিও তাদের ঐতিহ্যবাহী ভূমি বর্তমানে চীনের নিয়ন্ত্রণে। এই ধরনের ভোটদান তিব্বতীয় জনগণের রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের নতুন এক মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই নির্বাচনের প্রতি কঠোর সমালোচনা জানিয়ে একটি লিখিত বিবৃতি প্রকাশ করে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তিব্বতীয় সরকার-নিঃসরণ কোনো বৈধ সংগঠন নয় এবং এটি চীনের সংবিধান ও আইন লঙ্ঘন করে। চীনা কর্তৃপক্ষ এটিকে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করে, যা তিব্বতীয় বিষয়কে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে।
তবে, নিবন্ধিত ভোটারদের সংখ্যা এবং তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এই চীনা দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রত্যাখ্যান করে। ৯১,০০০ ভোটার এই নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিব্বতীয় স্বশাসনের দাবিকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করছেন এবং চীনের মন্তব্যকে অগ্রাহ্য করছেন। এই বৃহৎ অংশগ্রহণ তিব্বতীয় জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা ও সংহতির প্রমাণ।
অনেক তিব্বতীয় এই ভোটকে তিব্বতীয় ধর্মীয় নেতা দালাই লামার ১৯৯৯ সালে ৯০তম জন্মদিন উদযাপনের পর থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন। দালাই লামা ১৯৫৯ সালে চীনা শাসন থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন, এবং তার পর থেকে তিব্বতীয় স্বশাসনের স্বপ্ন বহু নির্বাসিতের হৃদয়ে বেঁচে আছে। এই নির্বাচন সেই স্বপ্নকে পুনরায় জীবন্ত করে তুলেছে।
সুইজারল্যান্ডের জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৮ বছর বয়সী সোনাম পালমো, যিনি স্মার্টভোট তিব্বত প্রকল্পে কাজ করেন, তিনি উল্লেখ করেন যে, তিব্বতীয় জনগণের জন্য রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়া তিব্বতীয় নির্বাসিতদের দৃঢ়তা ও যৌথ লক্ষ্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
স্মার্টভোট তিব্বত একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যা তিব্বতীয় নির্বাসিতদের প্রার্থীদের সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করে এবং ভোটারদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। এই সাইটের মাধ্যমে ভোটাররা প্রার্থীর নীতি, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানে এবং তাদের পছন্দের ভিত্তিতে ভোট দেয়। এই ডিজিটাল উদ্যোগ তিব্বতীয় গণতন্ত্রের আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সেন্ট্রাল তিব্বত অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অনুমান করে যে, বিশ্বব্যাপী তিব্বতীয় জনগণের সংখ্যা প্রায় ছয় মিলিয়ন, যেখানে চীনের ২০২০ সালের জনগণনা অনুযায়ী তিব্বতীয় জনগণ সাত মিলিয়নের বেশি। তাই, নির্বাসিত ভোটাররা মোট তিব্বতীয় জনগণের একটি ছোট অংশ হলেও, তাদের ভোটদান তিব্বতীয় স্বশাসনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাড়াতে পারে।
নির্বাচিত সংসদ পাঁচ বছরের মেয়াদে কাজ করবে এবং তিব্বতীয় নির্বাসিত সম্প্রদায়ের জন্য নীতি নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগ্রহ এবং তিব্বতীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে। পরবর্তী ধাপে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তিব্বতীয় জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য বৈশ্বিক মঞ্চে আলোচনায় অংশ নেবে এবং চীনের সঙ্গে সংলাপের সম্ভাবনা অনুসন্ধান করবে।
এই নির্বাচনের ফলাফল তিব্বতীয় রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। নির্বাসিত সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন তিব্বতীয় স্বশাসনের দাবিকে শক্তিশালী করবে, যা ভবিষ্যতে তিব্বতীয় জনগণের জন্য আরও স্বায়ত্তশাসন ও মানবাধিকার অর্জনের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।



