বেলুচিস্তান প্রদেশে শনিবার সংঘটিত সমন্বিত হামলায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী জানিয়েছে, অন্তত ৯২ সশস্ত্র আক্রমণকারী নিহত হয়েছে। এই হামলা কুয়েতা ও পার্শ্ববর্তী শহরগুলোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়, যেখানে নিরাপত্তা কর্মী ও সাধারণ নাগরিকের প্রাণও হারিয়ে গেছে।
সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ১৫ জন নিরাপত্তা কর্মী এবং ১৮ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আক্রমণকারীদের সংখ্যা ও ক্ষতির মাত্রা সরকারী সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে, তবে স্বতন্ত্র তৃতীয় পক্ষের যাচাই এখনও বাকি।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর পেছনে ভারতের সমর্থন থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে, তবে ভারতের সরকার ধারাবাহিকভাবে এমন কোনো সমর্থনের অস্বীকার করেছে। এই অভিযোগ দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনাকে আবার তীব্র করে তুলেছে।
বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (BLA) পূর্বে এই হামলার দায়িত্ব গ্রহণ করে, যেখানে তারা উল্লেখ করেছে যে বহু সৈন্য নিহত হয়েছে। তবে উভয় পক্ষের দাবির স্বতন্ত্র যাচাই এখনো করা হয়নি।
বেলুচিস্তান দীর্ঘদিন ধরে জাতিগত বিদ্রোহের শিকার, যেখানে কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় গোষ্ঠীর মধ্যে সম্পদ বণ্টন, স্বায়ত্তশাসন ও মানবাধিকার সংক্রান্ত বিরোধ অব্যাহত। এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক ঘটনার পরিমাণ প্রদেশের ইতিহাসে অন্যতম রক্তাক্ত দিন হিসেবে বিবেচিত।
সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আক্রমণকারীরা কুয়েতা ও অন্যান্য শহরে নাগরিকদের লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় তারা বেলুচিস্তান জুড়ে “পরিষ্কারের” অভিযান চালিয়ে গিয়েছে এবং গোষ্ঠীর পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবি করেছে।
অভিযানের সময় কুয়েতার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন ও পার্শ্ববর্তী সড়ক সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়। মোবাইল নেটওয়ার্ক জ্যাম করা হয় এবং আঞ্চলিক রেল পরিষেবা নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে স্থগিত করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শারিফ এই ঘটনার পর সেনাবাহিনীর প্রশংসা করে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই সম্পূর্ণভাবে শেষ না হওয়া পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তার এই মন্তব্য দেশের নিরাপত্তা নীতি ও সামরিক কৌশলের দৃঢ়তা তুলে ধরে।
হামলার পূর্বে, সশস্ত্র গোষ্ঠী গ্রেনেড ও বন্দুক ব্যবহার করে প্রদেশের ১২টি শহর ও গ্রামে আক্রমণ চালায়। তারা পুলিশ, পারামিলিটারি, কারাগার ও সরকারি ভবনকে লক্ষ্য করে, যা প্রদেশের নিরাপত্তা কাঠামোকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
BLA দাবি করে, ফেডারেল সরকার বেলুচিস্তানের সমৃদ্ধ খনিজ সম্পদকে স্থানীয় জনগণের উপকারে না এনে, নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছে। এই অভিযোগ বেলুচিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষের মূল কারণগুলোর একটি।
স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা জোরপূর্বক নিখোঁজের অভিযোগ তুলেছেন, যা সরকারী দপ্তর অস্বীকার করে। এই ধরনের অভিযোগ প্রায়ই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকার সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
বেলুচিস্তানে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্নে চালু হওয়া বিদ্রোহের শিকড় ১৯৭০-এর দশকে খুঁজে পাওয়া যায়, যখন প্রথম বেলুচি জাতীয় আন্দোলন গঠিত হয়। তবু দশকের পর দশক ধরে সংঘাতের তীব্রতা কমেনি, এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সশস্ত্র আক্রমণ বাড়ছে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের বৃহৎ আক্রমণ ও পরবর্তী সামরিক প্রতিক্রিয়া পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতি ও ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে, চীনের সাথে চলমান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC) প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
একজন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, বেলুচিস্তানের এই রক্তপাতের পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান ও ভারত উভয়েরই কূটনৈতিক সংলাপের দরজা খোলা রাখা জরুরি, যাতে অঞ্চলীয় স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ কমে।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে নিরাপত্তা বাহিনীর আরও বিস্তৃত পরিষ্কার অভিযান চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে, পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকার স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধানের পথ অনুসন্ধান করতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় দিকেরই সতর্কতা ও প্রস্তুতি বাড়িয়ে চলা প্রত্যাশিত।



