কুমিল্লা জেলার বরুড়া উপজেলার ওড্ডা গ্রামে অবস্থিত ফাতেহ খাঁ জামে মসজিদ, প্রায় দুইশত পঞ্চাশ বছর আগে নির্মিত, তিনটি গম্বুজ ও ছয়টি মিনারসহ অনন্য মুসলিম শিল্পকলা নিদর্শন। মসজিদটি ১৭৮০ সালে স্থানীয় এক ধর্মানুরাগী ফাতেহ খাঁর নামে নির্মিত বলে ঐতিহাসিক রেকর্ডে উল্লেখ আছে। আজও দূর-দূরান্তের মুসলমানেরা এখানে জুম্মা নামাজের জন্য একত্রিত হন, বিশেষ করে শুক্রবারের ভিড় সর্বোচ্চ থাকে।
মসজিদের মূল কাঠামো ৩৬ ফুট লম্বা ও ১৮ ফুট চওড়া, চারপাশের প্রাচীরের পুরুত্ব তিন ফুট, যা স্থাপত্যের টেকসইতা নির্দেশ করে। সাদা ও কালো পাথরের শিলালিপি, আরবী ক্যালিগ্রাফি এবং ফুল-পাতার নকশা দেয়ালের ওপর খোদাই করা হয়েছে। গম্বুজের ভেতরে ও বাইরের দিকে সূক্ষ্ম নকশা, চাঁদ-তারার অলংকরণ এবং ছয়টি মিনারের চারপাশে সাজানো নকশা মুগ্ধতা যোগায়।
মসজিদের উত্তর দিকে তিনটি শতাব্দী পুরনো পাকা কবর রয়েছে, তবে কবরের মালিকের পরিচয় অজানা। পশ্চিম দিকের দিকে একসময় বিশাল নদীপথ ছিল, যেখানে বাণিজ্যিক নৌকা চলাচল করত; আজ সেই পথ বিলুপ্ত। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, মসজিদ ও দিঘি সংক্রান্ত নানা গল্প প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রচলিত।
স্থানীয় বয়স্ক নাগরিক, জয়নাল আবেদীন, আবু জাফর এবং মাওলানা মফিজুল ইসলামসহ অন্তত ছয়জনের মতে, ফাতেহ খাঁ নামের এক ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি এই মসজিদটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তারা মসজিদকে বরুড়া উপজেলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে গণ্য করে এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে সংরক্ষণ দাবি করেন। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক নিজাম উদ্দিনও মসজিদকে মুসলিম শিল্পকলার অনন্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
মসজিদটির স্থাপত্য শৈলী মোগল যুগের শিল্পকর্মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, বিশেষ করে গম্বুজের নকশা ও দেয়ালের শিলালিপি ঐ সময়ের কারিগরদের দক্ষতা প্রকাশ করে। কালো পাথরের শিলালিপিতে ধর্মীয় উক্তি ও সুরক্ষামূলক চিহ্ন রয়েছে, যা মসজিদকে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
বছরের পর বছর ধরে মসজিদটি স্থানীয় মুসলমানদের জন্য প্রার্থনা ও সামাজিক সমাবেশের কেন্দ্রবিন্দু রয়ে এসেছে। বিশেষ করে জুম্মা নামাজের সময় এখানে বিশাল ভিড় জমায়, যা মসজিদের আধ্যাত্মিক গুরুত্বকে পুনর্ব্যক্ত করে। তবে সময়ের সাথে সাথে কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি দেখা দিচ্ছে, ফলে সংরক্ষণ ও মেরামতের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
স্থানীয় সমাজের অংশগ্রহণে মসজিদ সংরক্ষণের জন্য সরকারকে আবেদন করা হয়েছে। তারা দাবি করেন যে, মসজিদটি যদি যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করা হয়, তবে ঐতিহাসিক নিদর্শন হারিয়ে যাবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পদ নষ্ট হবে।
এই ধরনের ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনা সংরক্ষণে শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মসজিদকে ক্ষেত্রভিত্তিক গবেষণার বিষয়বস্তু করে ব্যবহার করতে পারে, যাতে শিক্ষার্থীরা সরাসরি ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের সঙ্গে পরিচিত হয়। পাশাপাশি, স্থানীয় স্কুলে ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ ও সংস্কৃতির গুরুত্ব নিয়ে কর্মশালা আয়োজন করা যেতে পারে, যা তরুণ প্রজন্মকে ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলবে।
মসজিদটি বর্তমানে পর্যটন ও শিক্ষামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। যদি সরকার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ মিলে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তবে ভবিষ্যতে আরও বেশি শিক্ষার্থী ও গবেষক এই নিদর্শনকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে ইতিহাসের গভীরতা অনুভব করতে পারবেন।
**ব্যবহারিক টিপস:** ঐতিহাসিক স্থাপনা পরিদর্শনের সময় সঠিক পোশাক পরিধান করুন, ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন এবং স্থানীয় গাইডের নির্দেশনা মেনে চলুন। এছাড়া, মসজিদে প্রার্থনা বা ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশ নিতে চাইলে স্থানীয় সম্প্রদায়ের রীতিনীতি সম্মান করা জরুরি।



