বৈদেশিক ঋণ সেবা পরিশোধে FY২৪-২৫ আর্থিক বছরের শেষ পর্যন্ত ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে $৭.০৯ বিলিয়ন হয়েছে। এই পরিমাণটি একই সময়ে বাংলাদেশে প্রাপ্ত মোট অনুদান ও ঋণের $৯.৩ বিলিয়নের প্রায় ৭৬ শতাংশ গঠন করে।
মোট পরিশোধের মধ্যে $৫ বিলিয়ন মূলধন, যার মধ্যে $২.৬ বিলিয়ন সরকারী গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ যা পাবলিক এজেন্সিগুলি গ্রহণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, কাঁচা তেল আমদানি বিল পরিশোধে $১.৪১ বিলিয়ন ব্যয় করা হয়েছে। অবশিষ্ট $২.০৮ বিলিয়ন সুদ পরিশোধে গিয়েছে, যা অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ERD) প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে।
এই ঋণ সেবা খরচের ধারাবাহিক বৃদ্ধি পাঁচ বছরের মধ্যে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। FY২৪-এ সরকার $৬.০৮ বিলিয়ন মূলধন ও সেবা চার্জ পরিশোধ করেছে, যা FY২১-এ $৩.৩ বিলিয়নের তুলনায় দ্বিগুণ। FY১৩-এ প্রথমবার $১ বিলিয়ন সেবা খরচ অতিক্রমের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেতে দেখা গেছে।
FY২৫ শেষের দিকে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ স্টক $৮৭.৩ বিলিয়ন রেকর্ড করেছে। এর মধ্যে সরকারী ঋণ $৭৭.২৮ বিলিয়ন, আর বাকি অংশ পাবলিক সেক্টর এজেন্সিগুলোর গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ। পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ঋণ স্টকে প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। মোট বহিরাগত ঋণ দেশের মোট জিডিপির ১৮.৯৯ শতাংশ, যা ৪০ শতাংশের সীমার নিচে রয়েছে।
ঋণ সেবা বৃদ্ধির পেছনে কিছু বিদেশি ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়া একটি প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বেশিরভাগ ঋণ এখন কঠিন ঋণ হিসেবে বিবেচিত, যার সুদের হার উচ্চ এবং গ্রেস পিরিয়ড স্বল্প, ফলে পরিশোধের চাপ বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে।
পূর্বে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের ডিরেক্টর জেনারেল হিসেবে কাজ করা এক অর্থনীতিবিদ উল্লেখ করেছেন, পূর্ব সরকার বড় প্রকল্পের জন্য ব্যাপকভাবে ঋণ নিয়েছিল এবং বর্তমান সরকারও এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। এখন অনেক প্রকল্পের নির্মাণ শেষের দিকে পৌঁছেছে, ফলে মূলধন পরিশোধের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, ঋণ সেবা খরচের ধারাবাহিক বৃদ্ধি সরকারি ব্যয় কাঠামোতে চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে তেল ও গ্যাসের মতো মূল আমদানি পণ্যের মূল্য বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের পরিমাণ আরও বাড়বে, যা রপ্তানি ও মুদ্রা রিজার্ভের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, উচ্চ ঋণ সেবা পরিশোধের ফলে অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য উপলব্ধ তহবিল কমে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গতি ধীর করতে পারে। বিনিয়োগকারীরা এই পরিস্থিতিতে ঝুঁকি প্রিমিয়াম বাড়াতে পারেন, ফলে ঋণ গ্রহণের খরচও বাড়বে।
অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারকদের জন্য এখন ঋণ পুনর্গঠন ও সুদের হার হ্রাসের দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। যদি গ্রেস পিরিয়ডের শেষ হওয়া ঋণগুলোকে পুনঃবিন্যাস করা না যায়, তবে পরবর্তী আর্থিক বছরে সেবা খরচের অগ্রগতির হার আরও তীব্র হতে পারে।
বৈদেশিক ঋণের গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারী গ্যারান্টিযুক্ত ঋণের অংশ তুলনামূলকভাবে কম, তবে এই ঋণগুলো প্রায়ই উচ্চ সুদের হারযুক্ত, যা ভবিষ্যতে আর্থিক চাপ বাড়াতে পারে। তাই ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশলে গ্যারান্টি কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সামগ্রিকভাবে, বর্তমান ঋণ সেবা পরিমাণ দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি সতর্ক সংকেত। ঋণ পরিশোধের গতি যদি নিয়ন্ত্রিত না হয়, তবে ভবিষ্যতে মুদ্রা অবমূল্যায়ন, বাণিজ্য ঘাটতি এবং ঋণ সেবা ব্যয়ের অপ্রত্যাশিত বৃদ্ধি ঘটতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা পরামর্শ দিচ্ছেন, সরকারকে ঋণ সেবা ব্যয়ের পূর্বাভাসে আরও সুনির্দিষ্ট মডেল ব্যবহার করে বাজেট পরিকল্পনা করতে হবে এবং উচ্চ সুদের হারযুক্ত ঋণ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বিকল্প তহবিলের সন্ধান করতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে, আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে ঋণ শর্তাবলী পুনর্বিবেচনা করা এবং সম্ভাব্য রিফাইন্যান্সিং সুযোগ অনুসন্ধান করা দেশের আর্থিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, বৈদেশিক ঋণ সেবা খরচের ধারাবাহিক বৃদ্ধি, ঋণ স্টকের বৃদ্ধি এবং উচ্চ সুদের হারযুক্ত ঋণের উপস্থিতি বাংলাদেশের আর্থিক নীতি ও বাজারের জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। সঠিক ঋণ ব্যবস্থাপনা ও পুনর্গঠন কৌশল না থাকলে ভবিষ্যতে আর্থিক চাপ বাড়তে পারে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ পরিবেশকে প্রভাবিত করবে।



