আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) গত শুক্রবার বাংলাদেশ সরকারের কাছে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে অনিরাপদ তরলতা প্রদান থেকে বিরত থাকার এবং মুদ্রা হার সংস্কার সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানায়। এই সতর্কবার্তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাংক খাত সংস্কার কৌশল গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
বিবৃতি প্রকাশের পূর্বে IMF বাংলাদেশে আর্টিকল‑ফোর পরামর্শ সম্পন্ন করে, যা ২০২৪ সালের গণ‑অভ্যুত্থানের পর এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দেয়।
বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত সাড়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলার ঋণের শর্ত পূরণে অগ্রগতি মূল্যায়নের অংশ হিসেবে IMF এই মন্তব্য করেছে। ঋণ শর্তের মধ্যে ব্যাংক খাতের স্বচ্ছতা ও শক্তিশালীকরণ বিশেষভাবে উল্লেখিত।
বৈশ্বিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যাংক সংস্কার পরিকল্পনা তৈরির জন্য IMF মূলধনের ঘাটতি নিরূপণ, রাজস্ব সহায়তার কাঠামো নির্ধারণ এবং আইনগতভাবে দৃঢ় পুনর্গঠন পরিকল্পনার রূপরেখা প্রস্তাব করেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সম্পদের মান পর্যালোচনা, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং ব্যালান্স শিটের স্বচ্ছতা বৃদ্ধির আহ্বানও IMF থেকে এসেছে। এই পদক্ষেপগুলো ব্যাংকিং সিস্টেমের সুশাসন নিশ্চিত করতে লক্ষ্যভেদী।
বিনিময় রিজার্ভের গঠন পুনর্গঠন এবং মুদ্রা নীতি কঠোর রাখার প্রয়োজনীয়তা IMF জোর দিয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস না হওয়া পর্যন্ত নীতি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে, বিশেষত বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ব্যবহারকে সুশৃঙ্খল করতে হবে।
মুদ্রা হার সংস্কার সম্পূর্ণ ও ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন এবং হারকে আরও নমনীয় করা IMF‑এর আরেকটি মূল দাবি। সংস্কার বিলম্বিত হলে বাজারের অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতে পারে বলে সতর্কতা প্রকাশ করা হয়েছে।
দুর্বল ব্যাংকে অনিরাপদ তরলতা সহায়তা প্রদান থেকে বিরত থাকার বিষয়টি IMF‑এর বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি। অপ্রতুল মূলধনযুক্ত ব্যাংকে অতিরিক্ত তরলতা প্রদান করলে আর্থিক ঝুঁকি বাড়তে পারে, তাই সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
ইনফ্লেশন সংক্রান্ত তথ্যেও IMF স্পষ্টতা বজায় রেখেছে। অক্টোবর মাসে মোট মূল্যস্ফীতি ৮.২ শতাংশ ছিল, এবং ২০২৫‑২৬ অর্থবছরে ৮.৯ শতাংশে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ২০২৭ অর্থবছরে তা প্রায় ৬ শতাংশে নেমে আসবে বলে অনুমান করা হয়েছে।
দুর্বল কর রাজস্ব ও আর্থিক খাতের ঝুঁকি বৃদ্ধির ফলে সামষ্টিক‑আর্থিক চ্যালেঞ্জের মাত্রা বাড়ছে। সংস্কার দেরি হলে নিম্নমুখী ঝুঁকি উন্মোচিত হতে পারে, তাই সাহসী রাজস্ব ও আর্থিক সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন অপরিহার্য।
আর্থিক প্রবৃদ্ধি বিষয়ে IMF ২০২৫‑২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি বৃদ্ধিকে ৪.৭ শতাংশের কাছাকাছি অনুমান করেছে। মধ্যমেয়াদে এই হার প্রায় ৬ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে কঠোর মুদ্রা নীতি এবং নমনীয় বিনিময় হার প্রয়োগের ফলে রপ্তানি‑আমদানি মার্জিনে সাময়িক চাপ আসতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যাংকিং সেক্টরের স্বচ্ছতা ও সম্পদ মান উন্নয়ন শেয়ার মূল্যের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ সরকারকে ব্যাংক পুনর্গঠন ত্বরান্বিত করা, মুদ্রা নীতি শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং IMF‑এর ঋণ শর্ত পূরণে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। এই পদক্ষেপগুলো না হলে আর্থিক বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেতে পারে।



