বাংলাদেশ সরকার গত সপ্তাহে জ্বালানি তেলের দাম হ্রাসের নির্দেশ জারি করেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে রোববার, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন মূল্য প্রয়োগ হবে। এই পরিবর্তন পূর্বের মাসের ২ টাকার হ্রাসের ধারাবাহিকতা।
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিজেলের দাম ১০২ টাকা থেকে কমিয়ে ১০০ টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে কেরোসিনের মূল্য ১১৪ টাকা থেকে ১১২ টাকা, পেট্রলের দাম ১১৮ টাকা থেকে ১১৬ টাকা এবং অকটেনের দাম ১২২ টাকা থেকে ১২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সব চারটি জ্বালানির মূল্য একসাথে দুই টাকার হ্রাস পেয়েছে।
দাম হ্রাসের পেছনে সরকারী স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া রয়েছে। ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ শুরু করা হয়। এই পদ্ধতি অনুসারে প্রতি মাসে বাজারের পরিবর্তন অনুযায়ী নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়।
স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণের নীতিমালা ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪-এ প্রকাশিত হয়েছে। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, দেশে ব্যক্তিগত গাড়িতে অকটেন ও পেট্রল বেশি ব্যবহার হয়, ফলে এই জ্বালানিগুলোর দাম ডিজেলের তুলনায় বেশি রাখা হয়। এটি লাক্সারি আইটেমের ধারণা অনুযায়ী বাজারের বাস্তবতা প্রতিফলিত করে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের মূল্যের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। অন্যদিকে, বিমান জেট ফুয়েলের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এর কাছে। বিইআরসি শীঘ্রই নতুন জেট ফুয়েল মূল্যের ঘোষণা করবে।
ফার্নেস অয়েলের (ফার্নেস তেল) দাম নির্ধারণের জন্য বিইআরসি সম্প্রতি একটি শুনানি পরিচালনা করেছে। এই শুনানিতে শিল্পের প্রতিনিধিরা মূল্য নির্ধারণের মানদণ্ড ও বাজারের চাহিদা নিয়ে মতামত প্রকাশ করেছে। বিইআরসি শীঘ্রই সংশ্লিষ্ট জ্বালানির নতুন মূল্য প্রকাশের পরিকল্পনা জানিয়েছে।
দাম হ্রাসের ফলে পরিবহন খাতের ব্যয় কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। ট্রাক, বাস ও গাড়ি চালকদের জন্য প্রতি লিটারে দুই টাকার সাশ্রয় সরাসরি জ্বালানি খরচে প্রভাব ফেলবে। ফলে পণ্য পরিবহনের খরচ হ্রাস পেয়ে শেষ ভোক্তাদের কাছে দাম কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে, জ্বালানি তেলের দাম হ্রাসের ফলে তেল শোধনাগার ও রিটেলারদের মার্জিনে সাময়িক চাপ আসতে পারে। স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণের সূত্রে আন্তর্জাতিক তেল মূল্যের ওঠানামা অন্তর্ভুক্ত থাকায়, সরকারী হস্তক্ষেপের পরিমাণ সীমিত। তাই শোধনাগারগুলো বাজারের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে অতিরিক্ত ব্যয় শোষণ করতে পারে।
মুদ্রাস্ফীতি দৃষ্টিকোণ থেকে জ্বালানি মূল্যের এই হ্রাস ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। জ্বালানি খরচের হ্রাস গৃহস্থালী ও ব্যবসায়িক খাতে ব্যয় কমিয়ে সামগ্রিক মূল্যস্তরে স্থিতিশীলতা আনতে পারে। তবে, স্বল্পমেয়াদে তেল শোধনাগার ও রিটেলারদের লাভের হ্রাসের ঝুঁকি রয়ে যাবে।
দীর্ঘমেয়াদে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণের সিস্টেমের কার্যকারিতা বাজারের স্বচ্ছতা বাড়াবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক তেল মূল্যের পরিবর্তন স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিফলিত হওয়ায়, হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি বা হ্রাসের ঝুঁকি কমবে। তবে, সরকারকে নিয়মিতভাবে সূত্রের পরামিতি পর্যালোচনা করতে হবে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, বর্তমান হ্রাসের পরবর্তী মাসে দাম পুনরায় সমন্বয় হতে পারে যদি আন্তর্জাতিক তেল মূল্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। তাই, জ্বালানি খাতের স্টেকহোল্ডারদের জন্য ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
সারসংক্ষেপে, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর নতুন জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে দুই টাকার হ্রাসের ফলে ভোক্তা, পরিবহন ও ব্যবসা খাতে তাত্ক্ষণিক সাশ্রয় হবে। স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণের কাঠামো বজায় রেখে সরকার বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখবে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক তেল মূল্যের ওঠানামা মূল্যের পুনরায় সমন্বয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হবে।



