চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)‑এ বিদেশি কোম্পানিকে লিজে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধে শ্রমিক-কর্মচারীরা শনিবার সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত কাজ বন্ধ করে আট ঘণ্টা বন্দর কার্যক্রম স্থবির করে। এই কর্মবিরতির ফলে বন্দর পরিচালনা ব্যাহত হয় এবং সরকারের রাজস্ব ক্ষতি নিরূপণ ও দায়ী ব্যক্তিদের সনাক্তকরণের জন্য ছয় সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।
বন্দরের চিফ পারসোনাল অফিসার স্বাক্ষরিত আদেশে কর্মবিরতিতে নেতৃত্ব দেওয়া চারজনকে চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন, নৌ, অর্থ ও হিসাব, এবং প্রকৌশল বিভাগে থেকে বদলি করা হয়। বদলির লক্ষ্য ছিল জরুরি দাপ্তরিক ও অপারেশনাল কাজের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা।
বদলি প্রাপ্ত চারজনের নাম হলেন অডিট সহকারী মো. হুমায়ুন কবির, নৌ বিভাগের ইঞ্জিন ড্রাইভার মো. ইব্রাহিম খোকন, উচ্চ হিসাব সহকারী মো. আনোয়ারুল আজিম এবং প্রকৌশল বিভাগের এস.এস. খালাসী মো. ফরিদুর রহমান। প্রথম দুইজন বন্দরের জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়ক, আর বাকি দুইজন সংগঠনের নেতা হিসেবে পরিচিত।
বদলির আদেশ অনুযায়ী, এই চারজনকে আগামীকাল রোববার দুপুরের আগে পানগাঁও নৌ টার্মিনালে যোগ দিতে হবে, যেখানে তারা জরুরি প্রশাসনিক ও কার্যকরী দায়িত্ব পালন করবে। পানগাঁও টার্মিনাল, যা সরকার বিদেশি কোম্পানিকে ২২ বছরের জন্য পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা দায়িত্ব দিয়েছে, এখন এই কর্মীদের নতুন কর্মস্থল হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে।
প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারী শ্রমিকদের ওপর পূর্বে সতর্কতা জারি করা হয়েছিল; যারা কর্মবিরতিতে অংশ নেয়, তাদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার বন্দর ভবনের ভিতরে কর্মচারীরা মিছিলের মাধ্যমে প্রতিবাদ প্রকাশ করলেও, তা দ্রুত দমন করা হয়।
বন্দরের জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বদলি আদেশের পর বর্ণনা করেন, কর্মবিরতি ও বদলির সিদ্ধান্তের ফলে আন্দোলন আরও তীব্র হবে এবং তারা পানগাঁও টার্মিনালে যোগদান করবে না। তার মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে শ্রমিকরা সরকারের লিজ নীতি ও বন্দর পরিচালনা পদ্ধতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান বজায় রাখছে।
বন্দরের কার্যক্রমের অচলাবস্থা এবং কর্মবিরতির ফলে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতি সম্পর্কে সরকারী দৃষ্টিকোণ থেকে, বাংলাদেশ সরকার দ্রুত ক্ষতি নিরূপণ ও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার জন্য গঠিত কমিটি কাজ শুরু করেছে। এই কমিটি বন্দর পরিচালনা, লিজ চুক্তি এবং শ্রমিক সংগঠনের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে অনুরূপ বিরোধ রোধের জন্য প্রস্তাব প্রস্তুত করবে।
এনসিটি‑এর লিজ চুক্তি সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধে শ্রমিকদের প্রতিবাদ দেশের বাণিজ্যিক নীতি ও বিদেশি বিনিয়োগের প্রতি জনমতকে উন্মুক্ত করেছে। সরকারী পক্ষ থেকে এই চুক্তি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বলে দাবি করা হলেও, শ্রমিকদের মতে বন্দরকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে রক্ষা করা উচিত এবং বিদেশি কোম্পানির স্বার্থে তা হস্তান্তর করা যাবে না।
বন্দরের কার্যক্রম পুনরায় চালু হওয়ার পরেও শ্রমিক সংগঠনগুলো পুনরায় সমাবেশের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে, যা সরকারকে শ্রমিকদের দাবির প্রতি সংবেদনশীলতা দেখাতে এবং বন্দর পরিচালনা নীতিতে স্বচ্ছতা আনতে বাধ্য করতে পারে। এই পরিস্থিতি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শ্রমিক আন্দোলন ও সরকারী নীতি একসঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক চিত্রকে প্রভাবিত করে।
বন্দরের বদলি আদেশ ও কর্মবিরতির পরবর্তী ধাপগুলোতে সরকারী ও শ্রমিক উভয় পক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজন হবে। যদি শ্রমিকরা তাদের প্রতিবাদ চালিয়ে যায়, তবে বন্দর কার্যক্রমের দীর্ঘমেয়াদী ব্যাঘাত ও আর্থিক ক্ষতি বাড়তে পারে। অন্যদিকে, সরকার যদি দ্রুত ক্ষতি নিরূপণ ও দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করে, তবে শ্রমিক আন্দোলনের তীব্রতা কমে যেতে পারে। ভবিষ্যতে এই সংঘাতের সমাধান দেশের বন্দর নীতি ও বিদেশি বিনিয়োগের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



