ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বহু সপ্তাহের গোপনীয়তা ভেঙে শনিবার তেহরানের উপকণ্ঠে প্রকাশ্যে উপস্থিত হন। তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মাজারে অনুষ্ঠিত প্রার্থনা সমারোহে অংশ নেন। উপস্থিতি দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
একই দিনে ইরানের সেনাবাহিনী প্রধান আমির হাতামি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে কঠোর সতর্কতা জানিয়ে বলেন, তাদের সামরিক বাহিনী বর্তমানে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। তিনি পারস্য উপসাগরে মার্কিন সরকারের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি উল্লেখ করে জানান, শত্রুপক্ষের কোনো ভুল কেবল তাদের নয়, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও ইসরায়েলের স্বার্থের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করবে।
হাতামি ইরানের পারমাণবিক প্রযুক্তি ধ্বংস করা অসম্ভব বলে জোর দেন। তিনি বলেন, শীর্ষ বিজ্ঞানীদের লক্ষ্যবস্তু করা হলেও এই সক্ষমতাকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। এই মন্তব্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক আলোচনার নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরীসহ একটি নৌ‑স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন করেছে। এই পদক্ষেপ অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিবেশকে তীব্র উত্তেজনায় পরিণত করেছে এবং ইরানের সতর্কতা বার্তাকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।
ইরানে গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে দ্রব্যমূল্যের তীব্র বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। প্রতিবাদকারীরা অর্থনৈতিক অবস্থা ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতার দাবি তুলে ধরেছিল, যা দেশের অভ্যন্তরে বিশাল উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল।
বর্তমানে বিক্ষোভের তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে, তবে অবশিষ্ট কিছু দল এখনও সরকারের নীতির বিরোধিতা করে চলেছে। ইরান সরকার বিক্ষোভকে দমন করার জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করেছে, ফলে জনসমাবেশের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে।
বিপরীত তথ্যসূত্রের ভিত্তিতে প্রাণহানির পরিমাণে বড় পার্থক্য দেখা যায়। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ ৩,১১৭ জনের মৃত্যু ঘোষণা করেছে, যেখানে বিরোধী গোষ্ঠী ৩৬,০০০ের বেশি মৃত্যুর দাবি করে। উভয় পক্ষের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক চলমান, যা ঘটনার প্রকৃত প্রভাবকে অস্পষ্ট রাখে।
এই পার্থক্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়েছে। যদিও সরকার বিক্ষোভকে সীমিত করার চেষ্টা করছে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য পুনর্বাসন ও সহায়তা প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, খামেনির প্রকাশ্য উপস্থিতি ও হাতামির সতর্কতা ইরানের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নীতি সমন্বয়ের একটি অংশ হতে পারে। উভয় পদক্ষেপ সরকারকে শক্তিশালী করে তুলতে এবং আন্তর্জাতিক চাপের মোকাবেলায় একত্রিত করে।
আসন্ন সপ্তাহগুলোতে ইরান সরকার কীভাবে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক সামঞ্জস্য করবে, তা দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে মার্কিন সরকার ও মার্কিন সামরিক বাহিনীর পদক্ষেপ অঞ্চলীয় নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রভাবিত করবে।
সামগ্রিকভাবে, ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, পারমাণবিক নীতি ও বাহ্যিক সামরিক চাপের সংযোগ ভবিষ্যতে কূটনৈতিক আলোচনার জটিলতা বাড়াবে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সমন্বিত কৌশল গড়ে তোলাই পরবর্তী পর্যায়ের মূল চাবিকাঠি হবে।



