আসাম রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মার ধর্মভিত্তিক মন্তব্যের পর দেশব্যাপী প্রতিবাদ জোরদার হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও একই রকম সুরে কথা বলে, নির্বাচন‑সংকটে বাংলাদেশি সমস্যাকে ভোটের সরঞ্জাম হিসেবে তুলে ধরেছেন। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের দুই মাস আগে এই বক্তব্যগুলো রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
হিমন্তবিশ্ব শর্মা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মুসলিম ভোটারদের বাংলাদেশে গিয়ে ভোট দিতে বলার অভিযোগে ব্যাপক নিন্দা পেয়েছেন। তার মন্তব্যের ফলে বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদ শোভা ও র্যালি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সংবিধানিক অধিকার রক্ষার দাবি তোলা হয়।
বিপক্ষের দল, বিশেষ করে কংগ্রেস, শর্মার মন্তব্যকে ‘সামাজিক উত্তেজনা সৃষ্টিকারী’ বলে সমালোচনা করে এবং তাকে দায়ী করে যে তিনি ধর্মীয় বিভাজন বাড়িয়ে তুলেছেন। কংগ্রেসের নেতারা বলছেন, ধর্মভিত্তিক রেটোরিকের বদলে উন্নয়নমূলক নীতি গ্রহণ করা উচিত।
অমিত শাহের মতে, আসামের সাতটি জেলায় প্রায় ৬৪ লক্ষ ‘অনুপ্রবেশকারী’ বসবাস করছেন, যা তিনি কংগ্রেসের ২০ বছরের শাসনের ফল বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি যুক্তি দেন, এই জনসংখ্যা পরিবর্তন রাজ্যের সামাজিক কাঠামোকে বদলে দিয়েছে এবং এখন এই এলাকায় অনুপ্রবেশকারীরা সংখ্যাগুরু অবস্থানে পৌঁছেছে।
শাহের এই দাবিগুলোকে কংগ্রেস নেতারা ‘অবৈধ ও ভিত্তিহীন’ বলে খণ্ডন করেন। তারা বলেন, এমন অপ্রমাণিত সংখ্যা ব্যবহার করে ভোটারকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
আসামের বিধানসভা নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা সংশোধনের পরিকল্পনা প্রকাশিত হয়েছে। রাজ্য সরকার ৪-৫ লক্ষ মুসলিম ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ভোটের বন্টন ও জনসংখ্যাগত সমীকরণে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এই পদক্ষেপকে কংগ্রেস ‘ভোটার অধিকার লঙ্ঘন’ বলে সমালোচনা করেছে।
অমিত শাহের মতে, অনুপ্রবেশ রোধের জন্য ভোটের মাধ্যমে জবাব দিতে হবে। তিনি ভোটারদের আহ্বান জানান, যদি তারা অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে চান, তবে বিজেপিকে ভোট দিন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সাধারণ মানুষকে অস্ত্র হাতে সীমান্তে যেতে বলছেন না, বরং শর্মার সরকারই এই দায়িত্ব নেবে।
দেহমাজি জেলায় অনুষ্ঠিত এক সভায় অমিত শাহের বক্তব্য থেকে পরিষ্কার হয়েছে, বিজেপি বাংলাদেশি ইস্যুকে নির্বাচনের মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। তিনি কংগ্রেসকে বারবার লক্ষ্য করে বলেন, পরিস্থিতি ‘ভয়াবহ’ এবং তাই আবার বিজেপি শাসনে ফিরে আসা দরকার।
বিপক্ষের দল এই রকম রেটোরিককে ‘ধর্মীয় বৈষম্য’ ও ‘ভোটের ভিত্তিতে গোষ্ঠীবদ্ধতা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কংগ্রেসের প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেন, ভোটার তালিকা থেকে নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠী বাদ দেওয়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মৌলিক নীতি লঙ্ঘন।
আসন্ন নির্বাচনে মুসলিম ভোটারদের প্রভাবকে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যদি ভোটার তালিকা সংশোধন বাস্তবায়িত হয়, তবে নির্বাচনী ফলাফলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটতে পারে এবং রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।
অমিত শাহের মন্তব্যের পর কংগ্রেসের নেতারা মিডিয়ায় জানিয়েছেন, তারা ‘ধর্মীয় বৈষম্য’ ও ‘ভোটার অধিকার লঙ্ঘন’ নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেবে। তারা বলছেন, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।
রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় দল উভয়ই এই ইস্যুকে ভোটের মূল বিষয় হিসেবে তুলে ধরার ফলে আসামের রাজনৈতিক পরিবেশ তীব্রতর হয়েছে। উভয় দিকের রেটোরিকের মধ্যে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ও জনমত গঠনে বড় প্রভাব পড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে, যদি বিধানসভা নির্বাচন এই রকম ধর্মীয় ভিত্তিক বিতর্কের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়, তবে ফলাফল কেবল রাজ্যের নয়, দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক দিকনির্দেশনাকেও প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে, ধর্মীয় গোষ্ঠীর ভোটের ব্যবহার ও ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাবের ওপর নজর থাকবে।
এই পরিস্থিতিতে, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোও সতর্কতা প্রকাশ করেছে, তারা দাবি করছে যে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ন্যায়সঙ্গত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত, যাতে কোনো গোষ্ঠীকে বাদ দেওয়া না হয়।



