ফেনী শহরের নাজির রোডের টিপটপ মোড়ে শুক্রবার রাত ১০টার দিকে এক ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। টমটম চালক মাসুদ হাসান মাহিদ (১৯) এবং তার সঙ্গে থাকা কিশোর ইরফান (১৫) দুজনকে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করে। মাসুদ ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়ে যায়, আর ইরফানকে জরুরি চিকিৎসার পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়।
মাসুদ হাসান মাহিদ কুমিল্লার তিতাস থানা অধীনে অবস্থিত জয়পুর গ্রাম, মো. নয়নের ছেলে। তিনি পরিবারসহ ফেনী শহরে ভাড়া বাড়িতে থাকতেন এবং তার বাবা মো. নয়ন জানান, মাসুদ তার সঙ্গে বরফকলে কাজ করতেন। কয়েকদিনের অসুস্থতার পর শুক্রবার টমটম নিয়ে বের হওয়ার সময় তাকে কয়েকজন কিশোর ডেকে নিয়ে যায়। পরে কথোপকথনের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে এবং দুজনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়।
আহতদের দ্রুত ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর মুহূর্তে মাসুদকে গুরুতর অবস্থায় দেখা যায় এবং চিকিৎসকগণ তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ডাক্তারের মতে, তার বাম কাঁধ ও বুকে গভীর কাটার চিহ্ন ছিল, যা দ্রুত রক্তক্ষরণ ঘটায়। তার দেহ মর্গে রাখা হয় ময়নাতদন্তের জন্য। অন্যদিকে, ইরফানের বাম কান ও মুখে গভীর ক্ষত পাওয়া যায়; প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে চমেক হাসপাতালে উন্নত সেবা দেওয়ার জন্য পাঠানো হয়।
মাসুদের বাবা ঘটনাস্থল থেকে ফিরে এসে জানালেন, তার ছেলে অসুস্থ থাকায় কাজ করতে পারছিল না, তবে টমটম নিয়ে বের হওয়ার পর তাকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি স্থানীয় কিশোরদের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করেন যে তারা পূর্বে মাসুদের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল এবং এখন আবার তাকে হত্যা করেছে। তিনি দ্রুত গ্রেপ্তার এবং ন্যায়বিচার দাবি করেন।
ফেনী মডেল থানা ওয়াইস অফিসার গাজী মুহাম্মদ ফৌজুল আজিম জানান, ঘটনাটি জানার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং সন্দেহভাজন কিশোরদের মধ্যে একজনকে গ্রেফতার করেছে। তদন্ত চলমান থাকায় আরও তথ্য শীঘ্রই প্রকাশ করা হবে।
স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ঘটনাটিকে গ্যাং-সংক্রান্ত অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে কঠোর শাস্তি দেওয়ার কথা জানিয়েছে। বর্তমানে পুলিশ দল ঘটনাস্থল থেকে প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষী বিবৃতি গ্রহণ এবং আঘাতপ্রাপ্তদের চিকিৎসা সংক্রান্ত রেকর্ড বিশ্লেষণ করছে।
এই ঘটনার পর ফেনী শহরের নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিশ গ্যাং-সংক্রান্ত অপরাধ রোধে অতিরিক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া, টমটম চালকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ নির্দেশনা জারি করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
মাসুদ হাসান মাহিদের মৃত্যু এবং ইরফানের গুরুতর আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় সম্প্রদায়ের শোকের ছায়া ছড়িয়ে পড়েছে। পরিবার এবং প্রতিবেশীরা শোক প্রকাশের পাশাপাশি ন্যায়বিচারের জন্য দৃঢ় আহ্বান জানাচ্ছেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দ্রুত পদক্ষেপ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন।
এই ঘটনার পর ফেনী জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কাজ করা চিকিৎসক রুহুল মোহসেন সুজন জানান, মাসুদকে হাসপাতালে নিয়ে আসার আগে তার জীবনচিহ্ন হারিয়ে গিয়েছিল। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইরফানের মুখের ক্ষত গুরুতর হলেও সঠিক চিকিৎসা ও শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে তার জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
পুলিশের মতে, গ্রেফতার করা কিশোরের সঙ্গে অতিরিক্ত সন্দেহভাজনদের অনুসন্ধান চলছে। তদন্তের অংশ হিসেবে স্থানীয় গ্যাংয়ের কার্যক্রম, সদস্য পরিচয় এবং সম্ভাব্য সহায়তাকারী গোষ্ঠীর তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের আদালতে উপস্থাপন করা হবে।
ফেনী শহরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ একত্রে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। গ্যাং-সংক্রান্ত অপরাধের শিকারদের পরিবারকে সহায়তা প্রদান এবং পুনর্বাসন পরিকল্পনা তৈরির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এই দুঃখজনক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, স্থানীয় সমাজের নিরাপত্তা সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তরুণদের মধ্যে গ্যাং সংস্কৃতির বিরোধিতা করার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি চালু করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ রোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্রিয় ভূমিকা এবং সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য বলে সবাই একমত।



