গুম সংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও প্রাক্তন বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী গত সপ্তাহে ধানমন্ডি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স (বিলিয়া) মিলনায়তে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি: একটি পর্যালোচনা’ শীর্ষক সিম্পোজিয়ামে গুমকে মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেন।
বক্তা উল্লেখ করেন, মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবার শোক প্রকাশ করতে পারে, দাফন‑কাফনের রীতি সম্পন্ন করতে পারে, তবে গুমের শিকার হলে পরিবারকে কেবল অজানা অন্ধকারে ফেলে রাখা হয়, কখনোই জানে না শিকারের অবস্থান কোথায়।
এ ধরনের অনিশ্চয়তা শিকারের আত্মীয়স্বজনকে দীর্ঘ সময়ের জন্য অস্থির অবস্থায় রাখে; আশা‑হতাশার মাঝখানে আটকে তারা সামাজিক কলঙ্ক, আর্থিক সংকট এবং একঘেয়েমি সহ নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়।
বিলিয়া মিলনায়তে অনুষ্ঠিত এই সিম্পোজিয়ামটি মানবাধিকার পরিস্থিতির সামগ্রিক বিশ্লেষণ ও সমাধানের পথ অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে আয়োজিত হয়। মঈনুলের বক্তব্যের পাশাপাশি গুম সংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিশনের সাবেক সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, সাজ্জাদ হোসেন ও নূর খান লিটন, অধিকার‑এর পরিচালক তাসকিন ফাহমিনা, বিলিয়ার সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ একরামুল হক এবং বিলিয়ার পরিচালক রাষ্ট্রদূত এম. মারুফ জামানও অংশ নেন।
বিচারপতি শিবলী গুমের শিকারদের পরিবারে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদী মানসিক কষ্টের দিকে ইঙ্গিত করেন এবং আইনগত কাঠামোর দুর্বলতা তুলে ধরেন। সাজ্জাদ হোসেন গুমের ঘটনাগুলোকে দেশের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার ব্যবস্থার ওপর আঘাতকারী বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন। নূর খান লিটন গুমের তদন্তে স্বচ্ছতা ও দ্রুত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা জোর দেন।
অধিকার‑এর তাসকিন ফাহমিনা মানবাধিকার সংস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে গুমকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দায়িত্বশীলতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। ড. একরামুল হক গুমের শিকারদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা ও আইনি পরামর্শের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে, সরকারকে এই দিক থেকে সমর্থন বাড়াতে আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গুম সংক্রান্ত উদ্বেগের প্রতি বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া ও প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে মন্তব্য করেন, যদিও নির্দিষ্ট পদক্ষেপের উল্লেখ করা হয়নি।
সিম্পোজিয়ামের মূল উদ্দেশ্য ছিল গুমের ব্যাপকতা, তার মানবিক প্রভাব এবং বর্তমান আইনগত কাঠামোর ঘাটতি বিশ্লেষণ করে কার্যকর সমাধান প্রস্তাব করা। অংশগ্রহণকারীরা একমত যে গুমের শিকারদের পরিবারকে দ্রুত তথ্য প্রদান, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং পুনর্বাসন সহায়তা প্রদান করা জরুরি।
বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, গুমের ঘটনা শুধু একক পরিবারকে নয়, পুরো সমাজকে প্রভাবিত করে; তাই সরকার, আইনশৃঙ্খলা সংস্থা এবং মানবাধিকার সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। গুমের শিকারদের পুনরুদ্ধার ও পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বিশেষ আইন প্রণয়ন, তদন্তের স্বতন্ত্রতা নিশ্চিত করা এবং তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়ানো অপরিহার্য।
এই সিম্পোজিয়ামটি গুম সংক্রান্ত সমস্যার প্রতি জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নীতি নির্ধারকদের জন্য একটি রোডম্যাপ উপস্থাপন করেছে। ভবিষ্যতে গুমের শিকারদের পরিবারকে সমর্থন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য সরকারী ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
গুমকে মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ হিসেবে চিহ্নিত করা মঈনুলের মন্তব্য মানবাধিকার সংরক্ষণের গুরুত্বকে পুনরায় জোরদার করেছে এবং দেশের মানবাধিকার নীতির পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।



