25 C
Dhaka
Saturday, January 31, 2026
Google search engine
Homeবিজ্ঞানবেঙ্গল ডেল্টার গঠন, বঙ্গ ফ্যানের বৈশ্বিক গুরুত্ব ও উৎপত্তি, ভূ-প্রক্রিয়া

বেঙ্গল ডেল্টার গঠন, বঙ্গ ফ্যানের বৈশ্বিক গুরুত্ব ও উৎপত্তি, ভূ-প্রক্রিয়া

মৌসুমের শীর্ষে হিমালয়ের গলিত পানি মাত্র কয়েক দিনেই বঙ্গোপসাগরে পৌঁছে যায়, তবে একই উৎসের সেডিমেন্টের যাত্রা ভিন্ন। এই কণাগুলো হিমালয়ের শিলার গলন থেকে বেরিয়ে নদীর পথে প্রবাহিত হয় এবং সমুদ্রের দিকে পৌঁছাতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। সুতরাং, বৃষ্টির পানি দ্রুত বয়ে যায়, কিন্তু সেডিমেন্টের গতি ধীর এবং তার ভাগ্য জটিল। এই সেডিমেন্টই তলদেশের উর্বর মাটি গঠন করে, যা কৃষি ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য।

সেডিমেন্টের মধ্যে প্রায় পনেরো শতাংশই সমুদ্রের দিকে পৌঁছায় এবং সমুদ্রের নিচে সমানুপাতিকভাবে দক্ষিণে সরে যায়। এই অংশই বিশ্বের সবচেয়ে বিশাল সাবমেরিন ফ্যান—বঙ্গ ফ্যান—গঠন করে, যা বাংলাদেশীয় তটরেখা থেকে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার দক্ষিণে বিস্তৃত। ফ্যানের বিস্তার এবং গভীরতা এটিকে বৈশ্বিক স্তরে অনন্য করে তুলেছে, এবং এর পুরু স্তর কার্বন সঞ্চয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বঙ্গ ফ্যানের উৎপত্তি মিয়োসিন যুগে, অর্থাৎ বিশ কোটি বছরেরও বেশি আগে, চিহ্নিত হয়েছে। এই সময়ের সেডিমেন্টের সঞ্চয়ই বর্তমানের পদ্মা নদীর তলদেশে অবস্থিত ডেল্টার ভিত্তি গড়ে তুলেছে। ফলে মিয়োসিনের শেষের দিকে ডেল্টা গঠনের সূচনা ঘটেছে, যা আজকের গঙ্গা‑পদ্মা‑মেঘনা নদীজালকে সমর্থন করে। ফ্যানের স্তরে পাওয়া জীবাশ্ম রেকর্ড এই প্রাচীন সময়ের পরিবেশগত অবস্থার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে।

মিয়োসিনের পূর্বে, প্রায় একশইল্লিশ মিলিয়ন বছর আগে ক্রেটেসিয়াস যুগে গন্ডোয়ানা মহাদেশের ভাঙ্গন ঘটেছিল, যার ফলে ভারতীয় টেকটোনিক প্লেটের জন্ম হয়। এই প্রাচীন ভাঙ্গনের চিহ্ন আজ উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশে রায়মাহল বেসাল্ট ও অ্যান্ডেসাইট শিলায় কয়েক কিলোমিটার নিচে পাওয়া যায়, যা ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা নিশ্চিত করেছে। এই শিলাগুলি প্লেটের প্রাচীন গতিবিধির সরাসরি সাক্ষ্য।

প্রায় পঞ্চাশ মিলিয়ন বছর আগে ভারতীয় প্লেট উত্তর দিকে সরে ইউরেশিয়ান প্লেটের সঙ্গে ধাক্কা খায়। এই সংঘর্ষের ফলে ডেকান পর্বতমালার সেডিমেন্ট পূর্ব দিকের প্রান্তে জমা হয়ে একটি প্রাথমিক ডেল্টা গঠন করে। ডেকান ট্র্যাপসের আগ্নেয় কার্যকলাপও বিশাল পরিমাণে ভৌগোলিক উপাদান সরবরাহ করে, যা ডেল্টার গঠনকে ত্বরান্বিত করে। তবে হিমালয় পর্বত গঠনের আগে এই ডেল্টা সম্পূর্ণভাবে বিকশিত হতে পারেনি।

হিমালয়ের উত্থানই বেঙ্গল ডেল্টার মূল কাঠামো গড়ে তুলতে অপরিহার্য ছিল, কারণ উচ্চতর পর্বতমালা থেকে প্রবাহিত সেডিমেন্টের পরিমাণ বাড়লে গঙ্গা‑পদ্মা‑মেঘনা নদীজালের নেটওয়ার্ক গঠন সম্ভব হয়। উঁচু হিমালয় নদীর প্রবাহে তীক্ষ্ণ ঢাল তৈরি করে, যা সেডিমেন্টের দ্রুত পরিবহনকে সহজ করে। ফলে হিমালয় গঠনের সময়ই ডেল্টা বিস্তৃত হতে শুরু করে এবং আজকের মতো বিশাল রূপ নেয়।

ইন্ডিয়ান প্লেটের ধারাবাহিক উত্তরের দিকে অগ্রসর হওয়া তিব্বত প্লেটকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরে উঁচু করে তুলেছে, যা তীব্র মৌসুমী বৃষ্টিপাতের সৃষ্টি করে। শক্তিশালী বর্ষা বহু নদীকে হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে নিয়ে যায়, ফলে সেডিমেন্টের পরিবহন বাড়ে। তিব্বত প্লেটের উচ্চতা ও মোনসুনের তীব্রতা সরাসরি সম্পর্কিত, যা ডেল্টার ধারাবাহিক সম্প্রসারণে সহায়তা করে।

প্রাথমিক পর্যায়ে গঙ্গা নদী সম্ভবত পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে আরব সাগরে মিলিত হতো। মিয়োসিন যুগের শেষের দিকে, প্রায় পনেরো মিলিয়ন বছর আগে, ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলে নদীর পথ পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানের মতো পূর্ব দিকে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছাতে শুরু করে। প্যালিওফ্লো গবেষণায় দেখা যায় যে গঙ্গার পুরনো চ্যানেলগুলো আরব সাগরের দিকে নির্দেশিত ছিল, যা এই পরিবর্তনের স্পষ্ট প্রমাণ। এই পরিবর্তনই গঙ্গা‑পদ্মা‑মেঘনা সিস্টেমের আধুনিক রূপের ভিত্তি স্থাপন করে।

বেঙ্গল ডেল্টা এবং বঙ্গ ফ্যানের গঠন প্রক্রিয়া বুঝলে ভবিষ্যতে সেডিমেন্টের প্রবাহ ও সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন পূর্বাভাসে সহায়তা পাওয়া যাবে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবিক কার্যকলাপের প্রভাব বিবেচনা করে, ডেল্টা সংরক্ষণ ও সঠিক ব্যবস্থাপনা জরুরি। আন্তঃবৈজ্ঞানিক গবেষণা ও নীতি নির্ধারণে এই জটিল ভূ-প্রক্রিয়াগুলোর সমন্বিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। আপনি কি মনে করেন, এই প্রাকৃতিক গতিবিদ্যা কীভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলবে?

৯১/১০০ ১টি সোর্স থেকে যাচাইকৃত।
আমরা ছাড়াও প্রকাশ করেছে: ডেইলি স্টার
খবরিয়া প্রতিবেদক
খবরিয়া প্রতিবেদক
AI Powered by NewsForge (https://newsforge.news)
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments