মাতসুশিমা সুমাইয়া ২০২৪ সালে দক্ষিণ এশীয় ফুটসাল (SAF) চ্যাম্পিয়নশিপ জয় করে দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে নতুন মাইলফলক যোগ করেছেন। তার আগে তিনি একই বছরের SAF ফুটবল টুর্নামেন্টে শিরোপা জিতেছিলেন, ফলে দুইটি ভিন্ন শাখায় শিরোপা জেতা বিরল ক্রীড়াবিদ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।
সুমাইয়ার ক্রীড়া যাত্রা ক্রিকেট থেকে শুরু হয়। ছোটবেলায় তিনি ক্রিকেটার হতে চেয়েছিলেন, তবে ব্যাটের আঘাতে ঠোঁটের গভীর কাটে ভুগতে হয় এবং প্লাস্টিক সার্জারির দরকার পড়ে। এই ঘটনার পর তার পিতা তাকে ক্রিকেট থেকে দূরে রাখেন এবং ফুটবলে মনোযোগ দিতে উৎসাহিত করেন।
ফুটবলে প্রবেশের পর সুমাইয়া দ্রুতই স্থানীয় ক্লাবে খেলা শুরু করেন এবং তার দক্ষতা দ্রুত নজরে আসে। তিনি জাতীয় দলেও নির্বাচিত হন এবং ২০২৪ সালে SAF ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে দলের সঙ্গে শিরোপা জয় করেন। এই সাফল্য তাকে দেশের ফুটবলে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান এনে দেয়।
ফুটবলে শিরোপা জয়ের পর সুমাইয়া এবং তার সহকর্মীরা নতুন চ্যালেঞ্জের সন্ধান পায়—ফুটসাল। ২০২৪ সালের প্রথম SAF ফুটসাল টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ দল অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নেয়। টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী বেশিরভাগ দলই এএফসি কোয়ালিফায়ার থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে আসলেও, বাংলাদেশ দল তুলনামূলকভাবে কম অভিজ্ঞ ছিল।
সুমাইয়া জানান, প্রথমবারের মতো SAF ফুটসালে চ্যাম্পিয়ন হওয়া তাদের জন্য অপ্রত্যাশিত আনন্দের মুহূর্ত। “এটি আমাদের প্রথম টুর্নামেন্ট ছিল, তাই অভিজ্ঞতার দিক থেকে আমরা পিছিয়ে ছিলাম,” তিনি বলেন। তবে সিনিয়র ও জুনিয়র, অভিজ্ঞ ও নবীন খেলোয়াড়ের সমন্বয়ে গঠিত দলটি সমন্বিত ভারসাম্য বজায় রাখে এবং শেষ পর্যন্ত শিরোপা জয় করে।
ফুটবলে ১১ জনের দল গঠন করে সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিতে পারা যায়, কিন্তু ফুটসালে প্রতিটি মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়, এটাই সুমাইয়ার মতে ফুটসালের প্রধান পার্থক্য। “ফুটসালে প্রতিটি সেকেন্ডে মনোযোগ বজায় রাখতে হয়, সিদ্ধান্ত তৎক্ষণাৎ নিতে হয়,” তিনি ব্যাখ্যা করেন। উভয় শাখাই পরিশ্রমের দাবি রাখে, তবে গতি ও তীক্ষ্ণতা ফুটসালে বেশি প্রয়োজন।
দুটি শিরোপা নিয়ে সুমাইয়া উভয়ই সমানভাবে মূল্যায়ন করেন। “দুটি অর্জনই আমার জীবনের বড় অর্জন, কোনটি বেশি নয়,” তিনি উল্লেখ করেন। শিরোপাগুলো তার ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে রয়ে যাবে।
ফুটসাল দলের গঠন প্রক্রিয়ায় সুমাইয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি প্রস্তাব করেন যে পুরুষদের মতোই নারীদেরও ফুটসাল দল গঠন করা উচিত এবং চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য লড়াই করা যায়। এই প্রস্তাবের পর ফেডারেশন বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করে।
ইমরান স্যার (ফুটসাল চেয়ারম্যান) এবং তাবিথ স্যার (বাংলাদেশ ফুটবলের সভাপতি) দল গঠনে এবং প্রস্তুতিতে বিশাল পরিশ্রম করেন। সুমাইয়া সব কৃতিত্ব তাদেরই দেন, কারণ তাদের সমর্থন ও নেতৃত্ব ছাড়া দলটি এই সাফল্য অর্জন করতে পারত না।
কেউ কেউ তাকে বলেছিলেন যে তিনি জাতীয় ফুটবল দল থেকে বাদ পড়ার পর ফুটসালে খেলছেন, তবে সুমাইয়া তা স্বীকার করেন না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “ফুটসাল দলও জাতীয় দল, ফুটবলের চেয়ে কম নয়,” এবং এটিকে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় ক্রীড়া হিসেবে দেখেন।
বিশ্বব্যাপী ফুটসালের জনপ্রিয়তা বাড়ছে, এবং সুমাইয়া বিশ্বাস করেন যে এই প্রবণতা বাংলাদেশেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। তিনি উল্লেখ করেন, “ফুটসালকে ছোট করে দেখা যায় না, বরং এটি দেশের ক্রীড়া উন্নয়নের নতুন দিক খুলে দেবে।”
সুমাইয়ার কাহিনী দেখায় কীভাবে একটি ছোট দুর্ঘটনা ক্যারিয়ারকে নতুন পথে নিয়ে যায় এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে বহু শিরোপা অর্জন করা সম্ভব। তার অভিজ্ঞতা তরুণ ক্রীড়াবিদদের জন্য প্রেরণার উৎস, যারা কোনো বাধা পেলে নতুন সুযোগের সন্ধান করতে পারে।
এখন সুমাইয়া এবং তার দল দেশের ফুটসাল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের উপস্থিতি বাড়ানোর লক্ষ্য রাখছে। তার নেতৃত্বে দলটি পরবর্তী আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের প্রস্তুতিতে মনোনিবেশ করেছে, যা দেশের ক্রীড়া জগতের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।



