ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গোর নর্থ কিভু প্রদেশের রুবায়া অঞ্চলে অবস্থিত কোলটান খনিতে ২৮ জানুয়ারি বুধবার এক বিশাল ভূমিধস ঘটেছে। স্থানীয় সরকারী মুখপাত্র লুমুম্বা কাম্বেরে মুইসা শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) জানিয়ে নিশ্চিত করেছেন যে প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা ২০০‑এর বেশি, এবং গভর্নরের উপদেষ্টা অনুমান করেন যে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা ২২৭ পর্যন্ত হতে পারে। এই দুর্ঘটনা মাটির অতিরিক্ত নরমত্ব ও ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে ঘটেছে, যেখানে শ্রমিকরা গভীর গর্তে কাজ করছিলেন এবং উপরে বিশাল মাটির স্তূপ ধসে এসে তাদের চাপা দেয়।
খনিটি ২০২৪ সাল থেকে এফসি/এম২৩ নামে পরিচিত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই গোষ্ঠি কোলটান বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে সামরিক কার্যক্রম চালায় বলে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন। খনিতে কাজ করা শ্রমিকদের বেতন অত্যন্ত কম, এবং অনেক নারী ও শিশুও সেখানে কাজ করছিলেন, ফলে এই ধসের ফলে তাদেরও প্রাণ হারাতে বাধ্য হয়েছে।
দুর্ঘটনা ঘটার পর স্থানীয় উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত কাজ শুরু করে, তবে কঠিন ভূগোলিক অবস্থান ও বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রণের কারণে উদ্ধার প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে। বর্তমানে প্রায় ২০ জন গুরুতর আহত ব্যক্তি নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন, আর বেঁচে থাকা কিছু শ্রমিকের অবস্থা এখনও অনিশ্চিত।
রুবায়া অঞ্চল বিশ্বব্যাপী কোলটান উৎপাদনের প্রায় ১৫ শতাংশ সরবরাহ করে। কোলটান থেকে উত্তোলিত ট্যান্টালাম আধুনিক মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, মহাকাশযানের যন্ত্রপাতি এবং গ্যাস টারবাইন তৈরিতে অপরিহার্য। এই ধাতুর উচ্চ চাহিদা এবং তার আর্থিক মূল্যই রুবায়া অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন উল্লেখ করেছে যে এফসি/এম২৩ বিদ্রোহীরা কোলটান লুট করে তাদের অস্ত্র ও সামরিক ব্যয় মেটাচ্ছে, এবং রুয়ান্ডা সরকার সরাসরি এই কার্যক্রমকে সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে কিগালি সরকারের পক্ষ থেকে রুয়ান্ডার এই অভিযোগের প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি, উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর চাপ বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের সম্পদ-ভিত্তিক সংঘাতের সমাধান না হলে কঙ্গোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অবনতি হবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর কূটনৈতিক স্বার্থও প্রভাবিত হবে।
আফ্রিকান ইউনিয়ন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যে রুবায়া অঞ্চলে মানবিক সহায়তা ও স্বেচ্ছা উদ্ধার কর্মসূচি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। ইউএন হিউম্যানিটেরিয়ান কোঅর্ডিনেটর উল্লেখ করেছেন, “এই ধসের ফলে সৃষ্ট মানবিক সংকটের মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি।” একই সঙ্গে, কঙ্গো সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কোলটান খনির স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ মিশন স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে।
অধিকন্তু, কঙ্গোর জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ আগামী সপ্তাহে রুবায়া অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও মানবিক সহায়তার অগ্রগতি নিয়ে বিশেষ সেশনের আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে। এই সেশনে কঙ্গো, রুয়ান্ডা, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আফ্রিকান ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা অংশ নেবে বলে জানানো হয়েছে। বিশ্লেষকরা আশা করছেন, এই আন্তর্জাতিক মঞ্চে কোলটান সম্পদের স্বচ্ছ বণ্টন, বিদ্রোহী গোষ্ঠীর আর্থিক উৎস বন্ধ করা এবং স্থানীয় শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নতুন নীতি গৃহীত হবে।
সামগ্রিকভাবে, রুবায়া কোলটান খনির এই বিধ্বংসী ঘটনা কঙ্গোর দীর্ঘস্থায়ী সম্পদ-সংক্রান্ত সংঘাতের একটি নতুন মাত্রা উন্মোচন করেছে। মানবিক ক্ষতি, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উত্তেজনা একসাথে মিলিয়ে এই দুর্যোগকে কেবল স্থানীয় নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপরও প্রভাব ফেলবে। ভবিষ্যতে এই ধরনের দুর্ঘটনা রোধে খনি নিরাপত্তা মানদণ্ডের কঠোর প্রয়োগ, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি এবং সম্পদ-ভিত্তিক অর্থায়ন বন্ধ করার আন্তর্জাতিক সমন্বয় প্রয়োজন।



