ঢাকার দক্ষিণ‑পূর্বাঞ্চলের একটি ড্রপ‑ইন সেন্টারে জানুয়ারি মাসে চারজন ভাসমান যৌনকর্মীর মধ্যে সিফিলিস ধরা পড়েছে। এই সেন্টারগুলো মূলত যৌনকর্মীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, কনডম, লুব্রিকেন্ট এবং যৌনবাহিত রোগের পরীক্ষা‑নির্ণয় প্রদান করে। সিফিলিস একটি যৌনবাহিত সংক্রমণ, যা অনিরাপদ যৌনসম্পর্কে বেশি দেখা যায়।
সেন্টার পরিচালনাকারী কর্মকর্তার মতে, পূর্বে প্রতি মাসে দুই থেকে তিনজনের মধ্যে সিফিলিসের রোগী শনাক্ত হতো। এই জানুয়ারি মাসে রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণের কাছাকাছি বেড়ে চারটি কেস রেকর্ড হয়েছে, যা পরিষেবার চাপ বাড়িয়ে তুলেছে।
ঢাকার মধ্যে মোট ছয়টি ড্রপ‑ইন সেন্টার চালু ছিল, তবে বর্তমান সময়ে মাত্র দুইটি সেন্টারই সক্রিয়। অবশিষ্ট সেন্টারগুলোও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সম্পূর্ণ সেবা প্রদান করতে পারছে না।
এই সেবার হ্রাসের প্রধান কারণ হল এইচআইভি‑এইডস ও অন্যান্য যৌনবাহিত রোগের প্রতিরোধে দাতাদের আর্থিক সহায়তা কমে যাওয়া। তহবিলের ঘাটতির ফলে কনডম, লুব্রিকেন্ট, এইচআইভি পরীক্ষা এবং রোগের চিকিৎসা সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে। ফলে এনজিওগুলো পূর্বের মতো মাঠে সক্রিয় থাকতে পারছে না; একের পর এক কর্মসূচি সংকুচিত বা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট প্রায় ৩৬,৫৯৩ জন ভাসমান যৌনকর্মী কাজ করে। ২০১৬ সালে ঢাকা জেলায় রাস্তায় কাজ করা ভাসমান যৌনকর্মীর সংখ্যা ৭,১৯৬ হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছিল। যদিও এই সংখ্যা পুরোনো, তবে বর্তমানে ঢাকার জন্য এটি একমাত্র নির্দিষ্ট হিসাব হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
ঢাকার পল্টন থানা এলাকার এক ভাসমান যৌনকর্মী, যাকে রাখী (ছদ্মনাম) বলা হয়, চার বছর ধরে এই পেশায় আছেন। তিনি পূর্বে সপ্তাহে একাধিকবার এনজিও কর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন, যারা তাকে কনডম সরবরাহ, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরামর্শ এবং রোগের ক্ষেত্রে ক্লিনিকের রেফারেল দিতেন। বড় সমস্যার ক্ষেত্রে কোন হাসপাতালে যেতে হবে, তা নিয়ে নির্দেশনা পেতেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রাখী উল্লেখ করেন, সেবা প্রদানকারী সংগঠনগুলো কমে যাওয়ায় এখন কনডমের সরবরাহ অনিয়মিত। “অনেক দিন পরপর কোনো আপা আসেন না, কনডমও আগের মতো পাওয়া যায় না,” তিনি বলেন। কনডমের অভাবে গ্রাহকের চাহিদা পূরণ না হলে আয় হারানোর ঝুঁকি থাকে, ফলে তিনি কখনও কখনও নিরাপদ নয় এমন যৌনসম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হন।
ঝুঁকিপূর্ণ যৌনসম্পর্কের ফলে এইচআইভি বা অন্যান্য যৌনবাহিত রোগের সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়ে। আর্থিক চাপ, বাসা ভাড়া এবং খাবারের অভাবের সঙ্গে মিলিয়ে এই পরিস্থিতি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
এনজিওগুলো আর্থিক ঘাটতির ফলে কর্মসূচি সংকুচিত হওয়ায় রেগুলার টেস্টিং ক্যাম্প, কনডম বিতরণ এবং রোগের ত্বরিত চিকিৎসা প্রদান করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে ভাসমান যৌনকর্মীরা প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বৃহত্তর হুমকি তৈরি করছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তহবিলের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। কনডম ও লুব্রিকেন্টের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, নিয়মিত টেস্টিং ক্যাম্প চালু করা এবং রোগের প্রাথমিক সনাক্তকরণে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া রোগের বিস্তার রোধে সহায়ক হবে।
অবশেষে, ভাসমান যৌনকর্মীদের স্বাস্থ্যসেবা পুনরায় শক্তিশালী করা এবং তাদের অধিকার রক্ষার জন্য নীতি নির্ধারকদের ত্বরিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এই পদক্ষেপগুলো না নিলে সিফিলিস, এইচআইভি এবং অন্যান্য যৌনবাহিত রোগের হার বাড়তে পারে, যা পুরো সমাজের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলবে।



