ইসরাইলের সামরিক বাহিনী গাজা অঞ্চলে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে চলমান সামরিক অভিযানকে নিয়ে প্রায় ৭০ হাজার ফিলিস্তিনির মৃত্যু স্বীকার করেছে। এই তথ্য জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক ব্রিফিংয়ে প্রকাশিত হয় এবং দেশীয় কয়েকটি প্রধান সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন করা হয়। স্বীকারোক্তি গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পূর্বের মৃত্যুর সংখ্যা সম্পর্কে ইসরাইলের প্রকাশিত সংশয়কে নতুন আলোকে তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই ঘোষণাকে মানবিক দিক থেকে গুরুতর উদ্বেগের সূচক হিসেবে উল্লেখ করছেন।
গাজা অঞ্চলে ইসরাইলের সামরিক অভিযান ৭ অক্টোবর হামাসের বিস্তৃত আক্রমণের পর শুরু হয় এবং তৎপরই বিস্তৃত বোমা হামলা, ভূমি ও আকাশ আক্রমণ চালিয়ে যায়। এই সময়কালে গৃহবন্দি, স্কুল, হাসপাতালসহ বহু বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংসের শিকার হয়েছে। ইসরাইলের পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে বলা হয়েছে যে এই আক্রমণগুলো হামাসের সামরিক কাঠামোকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছে। তবে বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলি পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা প্রকাশ করেছে।
আক্রমণের প্রথম কয়েক মাসে ইসরাইল গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মৃত্যুর সংখ্যা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল। ইসরাইলের যুক্তি ছিল যে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হামাসের নিয়ন্ত্রণে থাকায় তার তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। এই অবস্থানকে আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশেষ করে জাতিসংঘের মানবিক সংস্থা, দীর্ঘদিন ধরে অস্বীকার করেছে এবং গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যকে স্বতন্ত্র ও নির্ভরযোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
জাতিসংঘের মানবিক সংস্থা গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রেকর্ডকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে স্বীকৃত মৃত্যুর তালিকা হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। তারা উল্লেখ করেছে যে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রতিদিনের ভিত্তিতে মৃত ও আহতের সংখ্যা আপডেট করে এবং তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দ্বারা যাচাই করা হয়। তবে ইসরাইলের এই সংশয় গাজার জনগণের জন্য অতিরিক্ত কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ তা আন্তর্জাতিক সহায়তা ও ত্রাণ কার্যক্রমের গতি ধীর করে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি জানিয়েছে যে ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও বহু মানুষ আটকে আছে এবং তাদের উদ্ধার কাজ ধীরগতিতে চলছে। মৃতের তালিকায় বেসামরিক নাগরিক, নারী ও শিশুর সংখ্যা অধিকাংশই গঠন করে, যদিও নির্দিষ্টভাবে যোদ্ধা ও বেসামরিকের পার্থক্য করা হয়নি। মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়া মানুষদের সংখ্যা বাড়তে পারে, যা ত্রাণ সংস্থার কাজকে আরও জটিল করে তুলছে।
ইসরাইলের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট নিউজের সঙ্গে এক সামরিক কর্মকর্তা ব্রিফিংয়ে বলেন, তাদের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী গাজা অঞ্চলে প্রায় ৭০ হাজার বাসিন্দা নিহত হয়েছে। এই সংখ্যা নিখোঁজ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং তাই মোট মানবিক ক্ষতি আরও বেশি হতে পারে। কর্মকর্তার মন্তব্যে স্পষ্ট করা হয়েছে যে এই তথ্য সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ রেকর্ডের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।
ব্রিফিংয়ে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে গাজা অঞ্চলে এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত, যাদের অবস্থান ও স্বাস্থ্যের তথ্য এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। ইসরাইলের সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) এই বিষয়ে জানিয়েছে যে ভবিষ্যতে কোনো নতুন তথ্য বা প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিক ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকাশ করা হবে। এই প্রকাশের পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার জন্য একটি স্পষ্ট নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে।
ইসরাইলের এই স্বীকারোক্তির পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মানবিক আইন লঙ্ঘনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়েছে এবং বহু দেশ মানবিক তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন গাজা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইসরাইলকে আন্তর্জাতিক মানবিক মানদণ্ড মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে।
আঞ্চলিকভাবে, আরব দেশগুলোও গাজা জনগণের কষ্টের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে ত্রাণ সামগ্রী ও চিকিৎসা সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে সীমান্ত পারাপার প্রক্রিয়া জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা ত্রাণের গতি কমিয়ে দেয়। এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমতা ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকরা ইসরাইলের স্বীকারোক্তিকে একটি কূটনৈতিক সংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন, যা আন্তর্জাতিক চাপের ফলে মানবিক দায়িত্ব স্বীকারের একটি পদক্ষেপ হতে পারে। তবে তারা সতর্ক করে যে স্বীকারোক্তি একা যথেষ্ট নয়; বাস্তবিকভাবে ক্ষতিপূরণ, পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী সমাধান অর্জন করা কঠিন। তাই আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে গাজা অঞ্চলে সম্ভাব্য স্থগিত যুদ্ধ (সিসফায়ার) আলোচনা পুনরায় শুরু হতে পারে, যদিও উভয় পক্ষের মধ্যে বিশ্বাসের ফাঁক বড়। ইসরাইলের সামরিক বাহিনী উল্লেখ করেছে যে ভবিষ্যতে কোনো তথ্য প্রকাশের জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে, যা স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে। তবে ত্রাণ সংস্থাগুলো এখনও ধ্বংসাবশেষের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধার ও চিকিৎসা সেবা প্রদানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
গাজা সংঘাতের মানবিক পরিণতি এখনো সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়নি, তবে ৭০ হাজারের বেশি মৃত্যুর সংখ্যা ইতিমধ্যে একটি বিশাল মানবিক বিপর্যয়কে নির্দেশ করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এখন সময় এসেছে কেবলমাত্র তথ্য প্রকাশ নয়, বরং বাস্তবিক সহায়তা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার। গাজার জনগণের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গড়ে তোলা এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে মানবিক আইনের অধীনে কাজ করার আহ্বান করা জরুরি।



