আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সম্প্রতি ‘মিয়া’ শব্দ ব্যবহার করে মুসলিম ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে মন্তব্য করেন, যা রাজ্যের বিরোধী দল ও সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। মন্তব্যের পরেই অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এআইইউডিএফ) প্রধান বদরুদ্দিন আজমল কঠোর ভাষায় শর্মার কথা প্রত্যাহার না করলে আসামের মিয়া জনগণ তার নৌকা ডুবিয়ে দেবে বলে সতর্ক করেন। এই বিবৃতি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের দুই মাসের আগে প্রকাশিত হওয়ায় রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।
বদরুদ্দিন আজমল শুক্রবার একটি সমাবেশে বলেন, শর্মা যদি তার কথা ফিরিয়ে না নেন তবে মিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ তার নৌকা ডুবিয়ে দেবে এবং তারা কোনো ভয় দেখাবে না। তিনি অতীতে শর্মা মিয়াদের ঘরে খাবার খাওয়া, মাংস খাওয়া নিয়ে মজা করতেন এমন কথাও উল্লেখ করে, যা শর্মার প্রতি তার অসন্তোষের প্রকাশ হিসেবে তুলে ধরেন।
আজমল আরও উল্লেখ করেন যে শর্মা এক সময় মিয়াদের ঘরে খাবার খেয়ে আনন্দ পেয়েছিলেন, কিন্তু এখন তার মন্তব্য মিয়াদের গর্বকে আঘাত করেছে। তিনি মিয়াদের প্রতি সম্মান ও সমর্থনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, যদি শর্মা তার মন্তব্য প্রত্যাহার না করেন তবে মিয়াদের শক্তি ও ঐক্য শর্মার নৌকাকে ডুবিয়ে দেবে।
কংগ্রেসের মুখপাত্র জেহেরুল ইসলাম শর্মার মন্তব্যকে দরিদ্রবিরোধী হিসেবে খণ্ডন করে বলেন, মিয়াকে রিকশা চালকের পারিশ্রমিক কমিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে শর্মা কোনো সম্প্রদায়কে অপমান করেননি। তিনি শর্মার মন্তব্যকে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেন এবং মিয়াদের প্রতি সম্মান বজায় রাখার আহ্বান জানান।
কংগ্রেসের বিধায়ক শেরমান আলী আহমেদও একই রকম অবস্থান নেন। তিনি শর্মার মন্তব্যের প্রতি অগ্রাহ্য করার পরামর্শ দেন এবং মিয়াদের আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখার, তাদের কর্তব্য পালন করার এবং আগামী পনের বছর মধ্যে প্রতিটি গ্রামে আইএএস অফিসার, বিচারক, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার ও বিজ্ঞানীর সংখ্যা বাড়ানোর শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান।
আসামে দুই মাসের মধ্যে বিধানসভা নির্বাচন নির্ধারিত। এআইইউডিএফের প্রধান আজমল পূর্বাভাস দেন যে শর্মা যদি এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তবে বিজেপি জয়ী হবে না। তার মতে, মিয়াদের ভোটার তালিকায় শর্মার মন্তব্যের ফলে সৃষ্ট বিরোধই বিজেপির জন্য বড় বাধা হতে পারে।
আসামের মুসলিম জনগণের মধ্যে ‘মিয়া’ শব্দটি মূলত বাংলাভাষী মুসলিমদের সম্বোধন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যদিও অতীতে এটি অপমানসূচক শব্দ হিসেবে বিবেচিত হতো, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই শব্দটি স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং অনেকেই এটিকে পরিচয়ের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
শর্মা গত মঙ্গলবারও ‘মিয়া’ শব্দ ব্যবহার করে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেছিলেন, এসআইআর বা ভোটার তালিকা সংশোধন সম্পন্ন হলে রাজ্যের তালিকা থেকে চার থেকে পাঁচ লাখ মিয়া ভোটার বাদ দেওয়া হবে এবং তাদের বাংলাদেশে ভোট দেওয়ার অনুমতি দেওয়া উচিত। শর্মা দাবি করেন, এ ধরনের ভোটার আসলে আসামে নয়, তাই তাদের ভোটাধিকার সীমিত করা প্রয়োজন।
এই ধারাবাহিক মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া আসামের রাজনৈতিক পরিবেশকে জটিল করে তুলেছে। শর্মার ‘মিয়া’ ব্যবহার এবং ভোটার তালিকা সংশোধন সংক্রান্ত বক্তব্যের ফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে, যা আসন্ন নির্বাচনে ভোটার আচরণ ও পার্টি কৌশলকে প্রভাবিত করতে পারে। বিরোধী দলগুলো শর্মার মন্তব্যকে ভোটার ভিত্তি ক্ষয় করার ঝুঁকি হিসেবে ব্যবহার করছে, আর শর্মা তার নীতি ও নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে এই পদক্ষেপকে যুক্তিযুক্ত করে তুলে ধরছেন।
ভবিষ্যতে আসামের রাজনৈতিক দৃশ্যপট কীভাবে গড়ে উঠবে তা এখনো অনিশ্চিত, তবে শর্মার মন্তব্যের ফলে উভয় পক্ষের উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধন, সংখ্যালঘু অধিকার ও নির্বাচনী কৌশল নিয়ে আলোচনা তীব্রতর হবে। এই প্রেক্ষাপটে পার্টিগুলোকে জনগণের অনুভূতি ও সংবেদনশীলতা বিবেচনা করে তাদের প্রচারাভিযান গড়ে তুলতে হবে।



