বাংলাদেশের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে রয়েছে এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলেছে। অন্তর্বর্তী সরকার আশিক চৌধুরীকে সিঙ্গাপুরের তরুণ ব্যাংকার হিসেবে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ পদে নিয়োগ করে আশার আলো জ্বালায়, তবে গত ১৬ মাসে এফডিআই প্রবাহে কোনো উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেনি।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশটি প্রতিযোগী দেশগুলোর থেকে পিছিয়ে রয়েছে, বিশেষত উচ্চতর গ্যাস ও বিদ্যুৎ খরচ, অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ এবং অবিকশিত অবকাঠামো মূল বাধা হিসেবে চিহ্নিত। এই চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবিলার জন্য সরকার আশিক চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে শক্তিশালী করতে চেয়েছিল, তবে বাস্তবে নতুন বিদেশি প্রকল্পের সংখ্যা কমে যাওয়ায় লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
আশিক চৌধুরীর শীর্ষ পদে আসার পরও নতুন এফডিআই প্রকল্পের নিবন্ধন হ্রাস পায়। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকালে আর্থিক খাতে কিছু স্থিতিশীলতা ফিরে আসে; বিশেষত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন থামানো যায় এবং ব্যাংকিং সিস্টেমে স্বল্পমেয়াদী শিথিলতা দেখা দেয়। তবুও বিনিয়োগের সামগ্রিক পরিবেশ সন্তোষজনক নয়, নতুন বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ হ্রাস পায় এবং দেশি-বিদেশি প্রস্তাবের নিবন্ধন হারও নিম্নমুখী থাকে।
বিনিয়োগের হ্রাসের ফলে বহু ছোট‑মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে লক্ষাধিক কর্মীর কর্মসংস্থান হারিয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের অংশ ২৩.৫১ শতাংশ ছিল, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২২.৪৮ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ২৮১ কোটি ডলারে সীমাবদ্ধ থাকে, যা পূর্ববছরের তুলনায় ১৯ শতাংশ কম।
বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহও হ্রাসের পথে। ছয় মাস ধারাবাহিকভাবে ঋণপ্রবাহের হার ৭ শতাংশের নিচে নেমে আসে, যদিও ক্ষমতাচ্যুত সরকারের শেষ মাসে এই হার ১০ শতাংশের বেশি ছিল। এই প্রবণতা ব্যাংকিং খাতে উচ্চ সুদের হার এবং ব্যবসার খরচের স্থবিরতা থেকে উদ্ভূত, যা নতুন বিনিয়োগের আকর্ষণ কমিয়ে দেয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং গ্যাস‑বিদ্যুতের উচ্চ মূল্য বিনিয়োগের পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ফেডারেশন অফ ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড চেম্বারস অব কমার্স ইনডিয়া (FICCI) এর সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী উল্লেখ করেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং উচ্চ জ্বালানি মূল্যের কারণে বিনিয়োগকারীরা সতর্কতা অবলম্বন করছেন।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের বিশ্লেষণেও একই দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পায়। তিনি বলেন, জমি প্রাপ্তি সহজ হলেও মানসম্মত বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের অভাব নতুন প্রকল্পের সূচনাকে বাধাগ্রস্ত করে। তাছাড়া, ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার এবং ব্যবসার সামগ্রিক খরচে কোনো উল্লেখযোগ্য হ্রাস না হওয়ায় বিনিয়োগের পরিবেশে উন্নতি দেখা যায় না।
মোস্তাফিজুর রহমান আরও উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে গ্যাস সংকট সমাধানে বৃহত্তর পরিকল্পনা না থাকায় শিল্পখাতের চাহিদা পূরণে ব্যর্থতা রয়ে গেছে। ব্যবসায়িক সেবার জন্য সরাসরি যেসব প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়, সেগুলোর ডিজিটালাইজেশন না হলে প্রক্রিয়াগত জটিলতা এবং সময়সীমা বৃদ্ধি পায়। চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য লোড‑অনলোডের সময় কমাতে কার্যকরী উদ্যোগের অভাবও উল্লেখযোগ্য সমস্যা।
নিট এফডিআই প্রবাহ যদিও সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে নতুন প্রকল্পের সংখ্যা হ্রাসের ফলে মোট বিনিয়োগের গতি ধীর হয়ে আছে। এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে বিনিয়োগের আকর্ষণ বজায় রাখতে গ্যাস‑বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা, সুদের হার হ্রাস এবং ডিজিটাল সেবার উন্নয়ন অপরিহার্য করে তুলেছে।
সারসংক্ষেপে, আশিক চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ পদে পরিবর্তন সত্ত্বেও বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহে কোনো উল্লেখযোগ্য উত্থান ঘটেনি। আর্থিক স্থিতিশীলতা ও রিজার্ভ রক্ষা করা হলেও বিনিয়োগের পরিবেশের মৌলিক কাঠামোতে সংস্কার না হলে নতুন প্রকল্পের আকর্ষণ কমে যাবে, যা দেশের উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে ঝুঁকি তৈরি করবে।



