স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পার হওয়ার পর, দেশীয় নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকরা পুনরায় প্রশ্ন তুলছেন—বাংলাদেশ কি সত্যিকারের ঐক্যবদ্ধ জাতি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে, নাকি এখনও কেবল রাষ্ট্র, পতাকা ও সংবিধানযুক্ত একটি বৃহৎ জনসমষ্টি? এই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে জাতি গঠনের মৌলিক উপাদান, যেমন নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ব এবং আইনকে ন্যায়ের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণের মানসিকতা। প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বর্তমান সামাজিক কাঠামো, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশ সরকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজ শুরু করে, তবে ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে দেখা যায় অনেক দেশই একই সময়ে রাষ্ট্রিক কাঠামো স্থাপন করে জাতিগত সংহতি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। আফ্রিকার কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান ও সোমালিয়ার মতো দেশগুলো স্বাধীনতা অর্জনের পরেও জাতি গঠনের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও পুনর্গঠনকালে জার্মানি জাতি গঠনের প্রক্রিয়াকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
জাতি গঠনকে শুধুমাত্র ভূগোলিক সীমানা বা একক ভাষা-ইতিহাসের সমষ্টি হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি একটি সম্মিলিত নৈতিক বোধ, সমষ্টিগত দায়িত্ববোধ এবং সমগ্র সমাজের আত্মসম্মানবোধের ওপর নির্ভরশীল। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আইনকে ভয়ের বস্তু নয়, বরং ন্যায়বিচারের প্রকাশ হিসেবে মান্য করা জরুরি। এমন মানসিকতা গড়ে তুলতে শিক্ষা ও কর্মসংস্থান দুটোই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিক্ষা ক্ষেত্রের বর্তমান অবস্থা প্রায়শই ডিগ্রি উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে থাকে, যেখানে নৈতিকতা, যুক্তিবোধ ও সামাজিক দায়িত্বের প্রশিক্ষণ কমে যায়। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, যদি শিক্ষাব্যবস্থা শুধুমাত্র পেশাগত দক্ষতা নয়, বরং নৈতিক ও নাগরিক গুণাবলীর বিকাশে মনোযোগ দেয়, তবে জাতি গঠনের ভিত্তি মজবুত হবে। একই সময়ে, বেকারত্ব ও অনিশ্চিত কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নাগরিকদের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয়, যা জাতিগত সংহতির পথে বাধা সৃষ্টি করে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য টেকসই নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যাতে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাসের বোধ জাগে। সমন্বিত পরিকল্পনা, দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র এবং সামাজিক সুরক্ষা নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ জাতি গঠনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এছাড়া, নীতি নির্ধারকদের উচিত শিক্ষার পাঠ্যক্রমে নাগরিকত্ব শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধকে অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে সমষ্টিগত দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই আলোচনার প্রভাব স্পষ্ট। জাতি গঠনের প্রশ্নের উত্তর না পেলে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও নীতি বাস্তবায়নে জনসাধারণের বিশ্বাস হ্রাস পেতে পারে। তাই, আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতিতে দলগুলোকে জাতি গঠনের কৌশলকে মূল মন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করতে হবে, যাতে ভোটারদের কাছে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা প্রদর্শন করা যায়।
অধিকন্তু, জাতি গঠনের দিক থেকে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষা সংস্কার ও কর্মসংস্থান নীতি জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মডেল হিসেবে কাজ করেছে। জার্মানির পুনর্গঠনকালে ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা জাতি গঠনের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব উদাহরণ বাংলাদেশকে তার নিজস্ব নীতি রূপায়ণে দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
সারসংক্ষেপে, স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকের বেশি সময়ে বাংলাদেশকে এখনো জাতি গঠনের মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে কেবল অর্থনৈতিক উপাদান নয়, বরং সামাজিক সংহতির মূল স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। নৈতিকতা ও নাগরিক দায়িত্বের প্রশিক্ষণ ছাড়া রাষ্ট্রিক কাঠামোই যথেষ্ট নয়।
ভবিষ্যতে, যদি সরকার এই বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে নীতি নির্ধারণে অন্তর্ভুক্ত করে, তবে জাতি গঠনের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব হবে। অন্যথায়, জাতীয় পরিচয়ের ঘাটতি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। তাই, জাতি গঠনের প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এখন কেবল একাডেমিক আলোচনাই নয়, বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য দিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।



