জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আজ একটি জরুরি সতর্কবার্তা দিয়ে জানান যে, সদস্য দেশগুলোর বকেয়া চাঁদা পরিশোধ না হলে সংস্থার বাজেট জুলাইয়ের মাঝামাঝি সম্পূর্ণ শূন্যে নামতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমান আর্থিক ঘাটতি সংস্থার কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে এবং তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপের প্রয়োজন। গুতেরেসের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মিডিয়ার নজরে আসে, যেখানে তিনি সদস্য দেশগুলোর বাধ্যবাধকতা পূরণে ব্যর্থতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুসারে, জাতিসংঘের মহাসচিব ১৯৩টি সদস্য দেশের রাষ্ট্রদূতকে এক চিঠি প্রেরণ করেন। চিঠিতে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, নির্ধারিত বাধ্যতামূলক চাঁদা না দিলে আর্থিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প থাকবে না। অন্যথায় সংস্থার আর্থিক সংকট আরও বাড়বে এবং কার্যকরী প্রোগ্রামগুলো বন্ধ হয়ে যাবে।
গুতেরেস চিঠিতে উল্লেখ করেন যে, বকেয়া অর্থের কারণে বাজেট বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, “যে অর্থ কখনো পাওয়া যায়নি, সেটি ফেরত দেওয়া যায় না” এবং এই পরিস্থিতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তিনি আরও জানান যে, অতীতেও জাতিসংঘ আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে, তবে বর্তমান অবস্থা ভিন্ন, কারণ এখন অনুমোদিত নিয়মিত বাজেটের বড় অংশই অপ্রদান করা হয়েছে।
মহাসচিবের মতে, জাতিসংঘের চাঁদা প্রদান সদস্য দেশগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতা এবং সংস্থার অখণ্ডতা বজায় রাখতে এটি অপরিহার্য। গুতেরেসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে বকেয়া অর্থের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা মোট প্রাপ্য অর্থের ৭৭ শতাংশের সমান। এই বিশাল বকেয়া পরিমাণ সংস্থার আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করেছে।
বকেয়া অর্থের পরিমাণ এত বড় যে, বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী অব্যবহৃত তহবিল সদস্য দেশগুলোকে ফেরত দিতে হয়। ফলে সংস্থা এখন একটি দুধারি তলোয়ারের মুখোমুখি, যেখানে না পাওয়া অর্থই ফেরত দিতে বলা হচ্ছে। গুতেরেস জোর দিয়ে বলেন যে, যদি সব সদস্য দেশ সময়মতো ও পূর্ণ অর্থ প্রদান না করে, তবে আর্থিক নিয়মকাঠামোতে মৌলিক সংস্কার আনা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
এই সতর্কবার্তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুক্তরাষ্ট্র, যা জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় দাতা, সম্প্রতি নিয়মিত বাজেট ও শান্তিরক্ষা তহবিলে আর অবদান না দিয়ে সরে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের পাশাপাশি, দেশটি একাধিক সংস্থা থেকে বেরিয়ে গেছে, যেগুলোকে তারা করদাতাদের অর্থের অপচয় বলে সমালোচনা করে। এই পরিস্থিতি সংস্থার আর্থিক ভিত্তিকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।
গুতেরেসের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অবদান বন্ধ হওয়া শুধুমাত্র তহবিলের ঘাটতি বাড়ায় না, বরং অন্যান্য সদস্য দেশগুলোরও দায়িত্ববোধকে প্রভাবিত করে। তিনি উল্লেখ করেন যে, সংস্থার সুষ্ঠু পরিচালনা এবং শান্তি রক্ষার মিশন বজায় রাখতে সকল সদস্যের সমানভাবে চাঁদা প্রদান করা আবশ্যক।
জাতিসংঘের আর্থিক সংকটের ফলে ভবিষ্যতে সংস্থার প্রোগ্রামগুলোতে কাটছাঁট, কর্মীসংখ্যা হ্রাস এবং গুরুত্বপূর্ণ মিশনগুলোর স্থগিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। গুতেরেসের সতর্কতা অনুসারে, যদি জুলাইয়ের মধ্যে তহবিল শূন্য হয়ে যায়, তবে শান্তিরক্ষা মিশন, মানবিক সহায়তা এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে বড় ধাক্কা লাগবে।
অধিকন্তু, গুতেরেস উল্লেখ করেন যে, আর্থিক নিয়মকাঠামোর সংস্কার ছাড়া সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। তিনি প্রস্তাব করেন যে, সদস্য দেশগুলোকে চাঁদা পরিশোধের সময়সূচি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে এবং বকেয়া অর্থের উপর সুদ আরোপের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এই ধরনের পদক্ষেপগুলো বকেয়া পরিমাণ কমাতে এবং ভবিষ্যতে আর্থিক অস্থিরতা রোধে সহায়ক হবে।
সংস্থার অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন যে, যদি বকেয়া চাঁদা পরিশোধে ত্বরান্বিত না হয়, তবে জাতিসংঘের বাজেটের ৫০ শতাংশেরও বেশি অংশ অপ্রাপ্ত থাকবে। এই পরিস্থিতি সংস্থার স্বচ্ছতা, কার্যকারিতা এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। গুতেরেসের বার্তা স্পষ্ট: আর্থিক সংকটের মুখে সংস্থার অস্তিত্বই ঝুঁকিতে।
পরবর্তী ধাপে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এই বিষয়টি নিয়ে বিশেষ সেশন অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে সদস্য দেশগুলোকে বকেয়া অর্থ পরিশোধের পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে হবে। গুতেরেস আশা প্রকাশ করেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সংকটকে অগ্রাহ্য না করে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে, যাতে সংস্থার মিশন অব্যাহত রাখা যায়। সংস্থার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সদস্য দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ আর্থিক সমর্থনের ওপর।



