ইরানের চলচ্চিত্র নির্মাতা মোহাম্মদ রসৌলফ রটারড্যাম শহরে শুক্রবার অনুষ্ঠিত একটি সংবাদ সম্মেলনে ইরানের ওপর সাম্প্রতিক দমনমূলক পদক্ষেপে সৃষ্ট গণহত্যা নিয়ে গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি ইন্টারপ্রেটারের মাধ্যমে বলেন, ইরানের জনগণের সঙ্গে তার দুঃখ ভাগাভাগি করার ইচ্ছা রয়েছে এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অপরাধকে নিন্দা করেন। এই বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে তার পাঁচটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের বিশ্বপ্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়।
সম্মেলনটি রটারড্যামের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে রসৌলফের পাশাপাশি সিরিয়া, আফগানিস্তান, সোমালিয়া ও ইউক্রেনের পরিচালকগণও অংশ নেন। প্রত্যেকের জন্য ডিসপ্লেসমেন্ট ফিল্ম ফান্ড থেকে একশো হাজার ইউরো (প্রায় ১২০,০০০ ডলার) অনুদান প্রদান করা হয়। এই তহবিলটি গত বছর ক্যাট ব্ল্যাঙ্কেট ও ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল রটারড্যামের হিউবার্ট বালস ফান্ডের উদ্যোগে চালু করা হয়।
ডিসপ্লেসমেন্ট ফিল্ম ফান্ডের লক্ষ্য হল শরণার্থী ও স্থানচ্যুত শিল্পীদের সৃজনশীল কাজকে সমর্থন করা, যাতে তারা নতুন পরিবেশে তাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে পারে। রসৌলফের পাশাপাশি অন্যান্য দেশ থেকে আসা পরিচালকগণও একই তহবিলের সুবিধা পেয়ে তাদের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ার উপভোগ করেন। এই উদ্যোগটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র জগতের মধ্যে বৈচিত্র্য ও মানবিক গল্পের প্রচারকে ত্বরান্বিত করে।
রসৌলফের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের শিরোনাম “সেন্স অফ ওয়াটার” এবং এর দৈর্ঘ্য ৩৯ মিনিট। এতে আলি নৌরানি ও বেহনুশ নাজিবি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন। গল্পটি এক ইরানি লেখকের সম্পর্কে, যিনি নির্বাসনে জার্মান ভাষা শিখতে গিয়ে নিজের অতীতের প্রেম, ক্রোধ, আনন্দ ও দুঃখের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করেন। এই চরিত্রের অভিজ্ঞতা রসৌলফের নিজস্ব নির্বাসিত জীবনের প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায়।
২০২৪ সালে রসৌলফকে ইরানে আট বছরের কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে হয়, ফলে তিনি দেশ ত্যাগ করে ইউরোপে আশ্রয় নেন। তার শরণাপন্ন অবস্থার পরেও তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ চালিয়ে যান এবং তার কাজগুলো আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি পায়। “দ্য সেক্রেড ফিগ” চলচ্চিত্রটি ২০২৪ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার অর্জন করে এবং জার্মানির প্রতিনিধিত্বে সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক ফিচার চলচ্চিত্রের জন্য অস্কার প্রার্থী হিসেবে নাম নিবন্ধিত হয়।
ইরান ত্যাগের পর রসৌলফ ইউরোপে নতুন সংস্কৃতিতে কাজ করার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। তিনি জানান, শরণার্থী হিসেবে নতুন পরিবেশে চলচ্চিত্র নির্মাণের পথ অজানা ও কঠিন, তবে একই সঙ্গে সৃজনশীল স্বাধীনতার নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। এই অভিজ্ঞতা তাকে তার নিজস্ব গল্প ও মানবিক বিষয়গুলোকে বিশ্বজনীনভাবে উপস্থাপন করতে সহায়তা করে।
সম্মেলনে রসৌলফের শোকের প্রকাশের পাশাপাশি তিনি ইরানের জনগণের সঙ্গে তার সমবেদনা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি কেবল তার নিজের নয়, পুরো জাতির কষ্টের প্রতিফলন। এই শেয়ার করা দুঃখই তার কাজের মূল প্রেরণা, যা মানবাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরতে চায়।
রসৌলফের বক্তব্য ও চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমাবেশে মানবিক সংকটের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বাড়িয়ে তুলেছে। তার শোক ও সমবেদনা ইরানের জনগণের জন্য একটি নৈতিক সমর্থন হিসেবে কাজ করবে, এবং শরণার্থীদের সৃজনশীল প্রচেষ্টার জন্য গ্লোবাল সমর্থনকে আরও দৃঢ় করবে।



