টেল আভিভ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, মস্তিষ্কের পুরস্কার নেটওয়ার্কের কার্যকলাপ বাড়ালে হেপাটাইটিস বি টিকায় অ্যান্টিবডি উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে পারে। গবেষণাটি ৮৫ জন সুস্থ স্বেচ্ছাসেবীর ওপর করা হয় এবং ফলাফল প্রথমবারের মতো মানবদেহে মস্তিষ্ক‑ইমিউন সংযোগের সরাসরি প্রমাণ দেয়।
মানব দেহে মানসিক অবস্থা ও ইমিউন সিস্টেমের পারস্পরিক প্রভাব বহু বছর ধরে গবেষণার বিষয়। ইতিবাচক মানসিকতা রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে, আর নেতিবাচক মানসিকতা ইমিউন প্রতিক্রিয়া হ্রাস করতে পারে—এ ধরনের সম্পর্ক পূর্বে প্রাণী পরীক্ষায়ও দেখা গিয়েছে। তবে মস্তিষ্কের পুরস্কার কেন্দ্র, যা প্রেরণা ও প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণ করে, মানব দেহে কীভাবে কাজ করে তা স্পষ্টভাবে জানা ছিল না।
এই ফাঁক পূরণে গবেষকরা নিউরোফিডব্যাক নামে একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বেচ্ছাসেবীদের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অঞ্চলের কার্যকলাপ সরাসরি পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দিয়েছেন। অংশগ্রহণকারীরা স্ক্রিনে দেখানো সংকেতের মাধ্যমে নিজের পুরস্কার নেটওয়ার্কের সক্রিয়তা বাড়ানোর চেষ্টা করতেন, আর অন্য একটি দলকে ভিন্ন মস্তিষ্ক নেটওয়ার্কের দিকে মনোযোগ দিতে বলা হয়েছিল। তৃতীয় দলকে কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি।
প্রশিক্ষণ শেষের পর সব অংশগ্রহণকারীকে একই সময়ে হেপাটাইটিস বি টিকা প্রদান করা হয়। টিকাদানের আগে এবং পরে দু’বার রক্তের নমুনা নিয়ে অ্যান্টিবডি মাত্রা মাপা হয়, যাতে টিকার প্রতি ইমিউন প্রতিক্রিয়া নির্ণয় করা যায়। গবেষণার ফলাফল দেখায় যে, পুরস্কার নেটওয়ার্কের কার্যকলাপ বাড়াতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবীরা টিকার পর অ্যান্টিবডি স্তরে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্য দুই দলের তুলনায় এই পার্থক্য স্পষ্ট।
গবেষকরা উল্লেখ করেন যে, এই ফলাফল টিকার কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্য নয়, বরং মস্তিষ্কের স্ব-সহায়ক প্রক্রিয়া—যাকে প্লাসেবো প্রভাব বলা হয়—কে শারীরিক রোগ প্রতিরোধে ব্যবহার করার সম্ভাবনা নির্দেশ করে। মস্তিষ্কের পুরস্কার ব্যবস্থা সক্রিয় হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইমিউন সিস্টেমকে উদ্দীপিত করা যায়, এ ধারণা এখন প্রথমবারের মতো মানবদেহে প্রমাণিত হয়েছে।
এই গবেষণার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল প্রথম মানবিক প্রমাণ যে মস্তিষ্কের পুরস্কার নেটওয়ার্ক ও ইমিউন ফাংশনের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। যদিও ফলাফল আশাব্যঞ্জক, গবেষকরা স্বীকার করেন যে, বর্তমান গবেষণার স্কেল সীমিত এবং ইমিউন প্রতিক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই বৃহত্তর নমুনা ও দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন, যাতে এই পদ্ধতিকে ক্লিনিক্যালভাবে ব্যবহারযোগ্য করা যায়।
অধিকন্তু, গবেষণাটি টিকার স্বয়ংক্রিয় কার্যকারিতা মূল্যায়ন নয়, বরং মস্তিষ্কের স্ব-নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কীভাবে রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে তা অনুসন্ধান করে। ভবিষ্যতে একই ধরনের নিউরোফিডব্যাক প্রশিক্ষণকে অন্যান্য টিকা বা রোগের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হলে, রোগীর স্বাস্থ্যের ফলাফল উন্নত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই গবেষণার ফলাফল স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিকোণ উন্মোচন করে। যদি মস্তিষ্কের পুরস্কার নেটওয়ার্ককে নিয়ন্ত্রিত করে ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করা যায়, তবে রোগ প্রতিরোধে মানসিক প্রশিক্ষণকে একটি সহায়ক উপায় হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে বর্তমানে এটি এখনও গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে এবং দৈনন্দিন চিকিৎসায় প্রয়োগের জন্য অতিরিক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের প্রয়োজন।
সারসংক্ষেপে, মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশের কার্যকলাপ বাড়িয়ে টিকার পর অ্যান্টিবডি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হতে পারে, যা প্লাসেবো প্রভাবের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করে। ভবিষ্যতে বৃহত্তর গবেষণা এই ধারণাকে আরও দৃঢ় করবে এবং সম্ভবত রোগ প্রতিরোধের নতুন কৌশল বিকাশে সহায়তা করবে।
পাঠকরা যদি নিজের মানসিক অবস্থা ও স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে আরও জানতে চান, তবে নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ইতিবাচক চিন্তাধারাকে দৈনন্দিন জীবনে অন্তর্ভুক্ত করা একটি সহজ ও নিরাপদ উপায় হতে পারে।



