চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) কে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধে কর্মচারীরা যে প্রতিবাদে অংশ নেয়, তার পরিপ্রেক্ষিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ কঠোর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বন্দর প্রশাসনের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক এক অফিস আদেশে সকল বিভাগীয় প্রধানকে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
বন্দরের প্রধান ভবনে বিএনপি সমর্থক শ্রমিক-কর্মচারীরা এনসিটি লিজের বিরোধে প্রতিবাদসূচি পালন করে, মিছিলের মাধ্যমে ভবনের চত্বরে ঘুরে এক পর্যায়ে প্রশাসনিক ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে। তারা বন্দর চেয়ারম্যানের কক্ষের সামনে দৃশ্যমানভাবে বিক্ষোভের চিহ্ন দেখায়, যা বন্দর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে শৃঙ্খলা ভঙ্গেরূপে বিবেচিত হয়।
একই দিনে হাইকোর্টের রায় প্রকাশ পায়, যেখানে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সংক্রান্ত রিটের আবেদন খারিজ করা হয়। আদালতের রায়ের ভিত্তিতে বন্দর কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপকে আইনি সমর্থন প্রদান করা হয়েছে।
বন্দরের অফিস আদেশে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯, সরকারি চাকরি আইন‑২০১৮, বন্দর কর্মচারী চাকরি বিধিমালা‑১৯৯১ এবং অন্যান্য প্রযোজ্য বিধি উল্লেখ করে কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রধানদেরকে এই বিধিগুলোর অধীনে যথাযথ শাস্তি আরোপের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।
বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়কারী মো. হুমায়ুন কবির শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে জানান, তারা আইনানুগভাবে আন্দোলন চালিয়ে আসছে এবং আদালতের রায়কে সম্মান করে চলছে। তিনি উল্লেখ করেন, রায়ের পর কোনো বিরূপ মন্তব্যের প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং যদি বন্দর কর্তৃপক্ষ বা সরকার আইনানুগ আন্দোলনের ওপর বাধা দেয়, তবে তারা তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলবে।
কবিরের মতে, বর্ধিত বিরোধের সম্ভাবনা রয়েছে এবং প্রয়োজনে বন্দরকে অচল করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তিনি কর্মচারীদের সতর্কতা দেন যে, কোনো বাধা না দিলে তারা কর্মসূচি বাড়িয়ে বন্দর কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
এনসিটি টার্মিনালটি ২০০৭ সালে নির্মিত হয় এবং নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি সংযোজনের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ ধাপে ধাপে মোট ২,৭১২ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছে। টার্মিনালটি প্রায় এক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এবং একসঙ্গে চারটি সমুদ্রগামী কনটেইনার জাহাজ থেকে আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে আমদানি‑রপ্তানি কনটেইনার লোড‑আনলোড করার সক্ষমতা রাখে।
গত বছরের ৭ জুলাই থেকে টার্মিনালের পরিচালনা চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড, যা নৌবাহিনীর অধীনস্থ একটি প্রতিষ্ঠান, গ্রহণ করে। এই কোম্পানি টার্মিনালের দৈনন্দিন কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করে এবং আধুনিক লজিস্টিক্স সিস্টেমের মাধ্যমে বন্দর কার্যকারিতা বাড়াতে কাজ করে।
নির্বাচনের পূর্বে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে টার্মিনালের পরিচালনার জন্য ১৫ বছরের মেয়াদে কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। চুক্তির শর্তাবলী অনুযায়ী ডিপি ওয়ার্ল্ড টার্মিনালের পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং উন্নয়ন সংক্রান্ত দায়িত্ব গ্রহণ করবে, যা সরকারী অনুমোদন পেয়ে কার্যকর করা হয়।
বন্দরের এই পদক্ষেপ এবং কর্মচারীদের সম্ভাব্য তীব্র আন্দোলন দেশের বাণিজ্যিক লজিস্টিক্সে প্রভাব ফেলতে পারে। আদালতের রায় এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের আদেশের পরবর্তী পর্যায়ে কী ধরনের আইনি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা দেশের বাণিজ্য নীতি এবং শ্রমিক সংগঠনের কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



