বৃহস্পতিবার তেজগাঁওতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে বিনিয়োগ সমন্বয় কমিটির সপ্তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজীকরণ, সেবা ডিজিটালাইজেশন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়ানোর জন্য গৃহীত সংস্কারগুলো পর্যালোচনা করা হয়। এই উদ্যোগগুলো দেশের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে গৃহীত, এবং প্রেস উইংের মাধ্যমে শুক্রবার সরকারী বিবৃতি প্রকাশ করা হয়।
কমিটির সভাপতি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত ও চেয়ারম্যান লুৎফে সিদ্দিকী উল্লেখ করেন, প্রক্রিয়াগত উন্নয়ন দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং সরাসরি মানুষের জীবিকা ও কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলে। শুল্ক হার বা বৈদেশিক বাজারে প্রবেশাধিকার আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে হলেও নীতিমালা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আমাদের হাতে, সেগুলোতে দক্ষতা বৃদ্ধি করলে দ্রুত ও দৃশ্যমান সুফল পাওয়া সম্ভব।
বৈঠকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সচিব ও প্রধানগণ উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত কর্মকর্তারা সমন্বিত সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন।
অনুমোদিত মূল প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের সক্ষমতা দশ গুণ বাড়ানো, একীভূত অনলাইন ব্যবসা শুরুর প্যাকেজ চালু করা, চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪ ঘণ্টার ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা প্রদান এবং সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় বন্ড ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন। এসব প্রস্তাব একমতিতে অনুমোদিত হয় এবং দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সময়সূচি নির্ধারিত হয়েছে।
কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের ক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা পূর্বে জমা দেওয়া নথি ও ঝুঁকি‑ভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে পরিষেবা সময় কমাতে লক্ষ্য রাখে। কর্মকর্তারা আশা করেন, এতে আমদানি‑রপ্তানি চক্র দ্রুত হবে এবং রপ্তানিকারক ও আমদানিকারকের জন্য লজিস্টিক্সের বাধা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
অনলাইন ব্যবসা শুরুর প্যাকেজটি ২৯টি সরকারি সেবা একক প্ল্যাটফর্মে একত্রিত করবে, যাতে উদ্যোক্তারা নিবন্ধন, লাইসেন্স, কর ফাইলিং ইত্যাদি একবারে সম্পন্ন করতে পারবেন। এই ব্যবস্থা ছোট ও মাঝারি শিল্পের প্রবেশ বাধা কমিয়ে নতুন ব্যবসার সংখ্যা বাড়াবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪‑ঘণ্টার ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা নগদ লেনদেনের দেরি দূর করবে, শিপিং এজেন্ট ও কার্গো মালিকদের ইলেকট্রনিক চ্যানেলের মাধ্যমে তৎক্ষণাৎ পেমেন্ট করতে সক্ষম করবে। ফলে বন্দর টার্নওভার বাড়বে এবং জাহাজের অপেক্ষার সময় কমবে।
সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় বন্ড ব্যবস্থাপনা সিস্টেম ম্যানুয়াল কাগজপত্রের পরিবর্তে ইলেকট্রনিক ওয়ার্কফ্লো গ্রহণ করবে, যা ইস্যু থেকে রিডেম্পশন পর্যন্ত প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, ত্রুটিমুক্ত এবং ব্যয়সাশ্রয়ী করবে। বাজার অংশগ্রহণকারীদের জন্য লেনদেনের গতি বাড়বে এবং তহবিলের ব্যবহার আরও কার্যকর হবে।
অধিকন্তু, একাধিক সংস্থার সমন্বয়ে একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে অনুমোদিত বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো দ্রুত বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়া অনুমোদন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত সময় কমিয়ে বিদেশি ও দেশীয় মূলধনের প্রবাহ ত্বরান্বিত করবে।
কমিটি ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো (এনএসডব্লিউ) উদ্যোগের সাফল্যও তুলে ধরেছে; এটি কয়েক মাসের মধ্যে সরকারি দপ্তরে প্রায় ১২ লক্ষ সরাসরি যাতায়াত কমিয়ে এনেছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় জটিলতা দূর করে এই সিস্টেমের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর সন্তুষ্টি ও প্রক্রিয়ার দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে চালু হওয়া স্বয়ংক্রিয় ট্রাক প্রবেশ ব্যবস্থা RFID ও বায়োমেট্রিক যাচাই ব্যবহার করে গাড়ির গমনাগমন দ্রুত করে, যা অপেক্ষার সময় কমিয়ে পোর্টের কনজেশন হ্রাস করেছে এবং কর্মীদের নিরাপত্তা বাড়িয়েছে।
অধিকাংশ কর্মকর্তার মতে, এই সমন্বিত সংস্কারগুলো বাংলাদেশকে বিনিয়োগের দৃষ্টিতে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করবে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যে দেশের প্রতিযোগিতা শক্তিশালী করবে। তবে বাস্তবায়নের সময় উদ্ভূত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় প্রয়োজন হবে।



