সিরিয়ার সরকার এবং কুর্দি-নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (SDF) গঠিত মিলিশিয়া জোট শুক্রবার একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, যার মাধ্যমে ধীরে ধীরে কুর্দি বাহিনী ও প্রশাসনিক সংস্থাগুলোকে রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে একীভূত করা হবে। এই চুক্তি পূর্বে উত্তরের পূর্বাঞ্চলে সংঘটিত কয়েক সপ্তাহের তীব্র লড়াইয়ের পর আসে, যেখানে সিরিয়ান সেনাবাহিনী SDF-র এক দশকের বেশি সময়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিশাল এলাকা পুনরুদ্ধার করেছে।
সিরিয়ার সরকার ও SDF-র মধ্যে সংঘর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে সিরিয়ান সেনা উত্তরের পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর ও কৌশলগত স্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে, যার মধ্যে তাবকা বাঁধ এবং ওমার তেলক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত। এই জয়গুলো সরকারকে কুর্দি-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোতে প্রভাব বাড়াতে সহায়তা করেছে এবং শেষ পর্যন্ত আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি টম বারাক এই চুক্তিকে সিরিয়ার জাতীয় পুনর্মিলন, ঐক্য এবং দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি এটিকে দেশের ভবিষ্যৎ গঠন প্রক্রিয়ার একটি ইতিবাচক ধাপ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন।
চুক্তির পূর্বে, SDF বড় পরিসরের ভূখণ্ড হারানোর পর একটি অস্ত্রবিরতি স্বীকার করে, তবে সংঘাতের কিছু অংশে এখনও গুলিবর্ষণ চলমান ছিল। সেই সময়ে SDF সরকারকে তাদের অধিকাংশ দখলকৃত এলাকা হস্তান্তর করার শর্তে চুক্তি স্বীকার করে, তবে সম্পূর্ণ শান্তি নিশ্চিত হয়নি।
নতুন চুক্তির মূল বিষয়গুলোতে SDF-র সংস্পর্শস্থল থেকে প্রত্যাহার, তাদের সদস্যদের সিরিয়ান সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তি এবং তাদের প্রশাসনিক ও নাগরিক সংস্থাগুলোর রাষ্ট্রের কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া, কুর্দি জনগণের জন্য একটি সামরিক বিভাগ গঠন করা হবে, যা তিনটি ব্রিগেড নিয়ে গঠিত হবে এবং SDF-র সদস্যদের নিয়ে গঠিত হবে।
এই সামরিক বিভাগটি কুর্দি সৈন্যদের সিরিয়ান জাতীয় সেনাবাহিনীর অংশ হিসেবে কাজ করবে এবং ভবিষ্যতে দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখবে।
চুক্তিতে কুর্দি জনগণের নাগরিক ও শিক্ষাগত অধিকার সংরক্ষণ, পাশাপাশি স্থানচ্যুতদের তাদের মূল বাসস্থানে ফিরে যাওয়ার গ্যারান্টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকার এই অধিকারগুলোকে কুর্দি সম্প্রদায়ের সামাজিক সংহতি ও উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করবে।
অধিকন্তু, SDF-র নিয়ন্ত্রণে থাকা কারাগার, তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রগুলো সরকারী নিয়ন্ত্রণে স্থানান্তর করা হবে। এই পদক্ষেপটি রাষ্ট্রের আর্থিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
সিরিয়ান সেনাবাহিনী ওমার তেলক্ষেত্র, যা দেশের সর্ববৃহৎ তেলক্ষেত্র, SDF-র প্রত্যাহারের পর দখল করে নিয়েছে, এবং পূর্বে তাবকা বাঁধের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণও পুনরুদ্ধার করেছে। এই সম্পদগুলো সরকারকে তেল ও জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন বাড়াতে সহায়তা করবে।
কুর্দি বাহিনী পূর্বে সিরিয়ার প্রায় এক তৃতীয়াংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইসলামিক স্টেট (IS) দমন করার পর অর্জিত হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাদের নিয়ন্ত্রণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
এই পরিবর্তনটি ডিসেম্বর ২০২৪-এ বশার আল-আসাদকে উৎখাত করার পর থেকে সিরিয়ার ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ১৩ বছর দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি চিহ্নিত করেছিল।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাআ, যিনি আসাদ শাসন উল্টে দেওয়ার পরের বিদ্রোহী আক্রমণ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, দেশকে পুনরায় একত্রিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি নতুন চুক্তিকে জাতীয় ঐক্য ও স্থিতিশীলতার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই চুক্তি সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সমাপ্তি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের ভিত্তি হতে পারে। তবে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় উভয় পক্ষের মধ্যে সমন্বয় ও বিশ্বাস গড়ে তোলার জন্য সময় ও প্রচেষ্টা প্রয়োজন হবে। ভবিষ্যতে কুর্দি জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও অধিকার সংরক্ষণে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের মূল প্রশ্ন রয়ে যাবে।



